আমাকে বাঁচান
বালিকা

২৭ নভেম্বর ২০১৮

২০১৮ সালে এইচ এস সি পরীক্ষার ৭ দিন আগের ঘটনা। ফেসবুকে সমকামিতার অধিকার নিয়ে একটি স্টাট্যাস দেই। ধর্মের নামে বাজে কিছু ছিল না সেই স্ট্যাটাসে। কিন্তু গ্রামের মূর্খ মোল্লারা সেটার বিরোধিতা করে। আমি একজন যৌন সংখ্যালঘু অধিকার কর্মী এবং সেই সুবাদে আমার আইডিতে সমকামিতার অধিকার আদায় নিয়ে অনেক লেখা ছিল। এই নিয়ে অনেক লেখালেখি করতাম।

আমি আসলে একজন প্রকাশ্য রূপান্তরকামী - একটি মেয়ে শরীরের ভেতর একটা ছেলের মন। আমি যৌনভাবে অন্য মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ করি বলে অনেকেই আমাকে মেয়ে সমকামী (লেজবিয়ান) ভাবে। গ্রামের উগ্রবাদীরা আমার সমকামিতা বিষয়টাকে মেনে নেয় নি। তারা আমার বিরোধিতা করে এবং সকালে গ্রামে বিচার বসায়। বিচার শেষ হয়ে গেলেও তারা ক্ষান্ত হয় নি। তারা আমাকে এসিড নিক্ষেপের পরিকল্পনা করে। কিন্তু কিছু ভাল মানুষের জন্যে আমি সেই যাত্রায় বেঁচে যাই। তারা আবার পাঁচ গ্রাম মিলিয়ে বিচার বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহন করে এবং বিচার বসায়। রাতে সেই বিচারে প্রায় হাজার খানেক মানুষের উপস্থিতি ছিল। আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে যা ইচ্ছে যেভাবে অপমান করা যায় সেটার পরিকল্পনা করে উগ্রবাদীরা। যেমন আমার চুল ছোট, এটা তাদের পছন্দ না। আমার চুল কাটা সহ আমাকে ১০০ বেত্রাঘাতের পরিকল্পনা ছিল তাদের। আমি ফুটবল খেলি সেটাও তাদের পছন্দ না। কিন্তু সেখানে কিছু ভাল মানুষ থাকায় এবং আইনের সাথে জড়িত আমার দুলাভাই সে ব্যাপারে সহায়তা করায় সেটা থেকেও বেঁচে যাই।

অবশেষে রায়ে বলা হয় যে এই সমকামী এবং নাস্তিক মেয়েকে গ্রামে রাখলে আরও দশটা মেয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। একে গ্রাম থেকে বিতারিত করা হোক। আমার পরীক্ষার তারিখও ঘনিয়ে আসছিল ধীরে ধীরে। বাড়িতে সাংবাদিক গোয়েন্দারা আসে। মালিকের সাহায্যে তাদের বিদায় করা হয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাদের দিয়ে আমার ছবি তুলে আঞ্চলিক পত্রিকায় খবর ছাপিয়ে দেয়। ভাবতে অবাক লাগে যে যেই আঞ্চলিক পত্রিকায় আমি কবিতা লেখতাম সেই পত্রিকাটিতেই আজ আমার এই খবর। তারপর আমি গ্রাম থেকে চলে যাই।

পরীক্ষা দেয়ানোর কোন পরিকল্পনা ছিলনা আমার পরিবারের। কিন্তু পরীক্ষার আগের দিন গ্রামের এক মুরব্বি চাচা এসে বলেন পরীক্ষা দিক। আমি সেই সকালেই রওনা হয়ে যাই এবং পরদিন সকাল ৯ টায় এসে পৌঁছাই। আর দশটায়ে পরীক্ষা শুরু হয়ে যায় যা আমি খুব ঝুঁকির সাথে দেই। সবগুলো পরীক্ষা এমন ভাবে দিচ্ছিলাম যেন আমার শরির থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। ফেসবুকে আমাকে জঙ্গিরা হুমকি দিত প্রতিনিয়ত। আমাকে খুব সাবধানে পরীক্ষার কক্ষে দিয়ে ও নিয়ে আসতো আমার পরিবার এবং মালিক কতৃপক্ষ৷ পুলিশের কাছে সাহায্য চাইলে তারা আমাকে দেয় নি কোন পাহারাদার। কারণ আমি একজন সমকামী।

তখন আমার বয়স ১৮ হয় নি বিধায় আমাকে তারা গ্রেফতার করে নি। তবে পুলিশ অনেক খারাপ কথা বললো। আমি কেন তসলিমা ভক্ত হব? কেন অভিজিৎ এর ভক্ত হব? কেন আমি জুলহাজ তনয়ের মত মানুষদের ভক্ত হব? কেন তাদের খুনের বিচার চাইবো? কেন তাদের মৃত্যুর বিচার চাইবো? ওরা এও বললো যে তসলিমা দেশ ছেড়ে গেছে ঠিকই কিন্তু যাওয়ার আগে নাকি ডিম পেড়ে গেছে আর আমরা তারই ফসল।

আমার চুল ছোট দেখেও অনেকে এ নিয়ে আমাকে গালি দেয়। এগুলো মাথায় রাখি নি। কিন্তু ওরা আমাকে গ্রাম ছাড়া করলো আমার লেখার জন্যেই। খুব অবাক হই এই মূর্খদের কর্মকান্ড দেখে। আমি আমার জীবন নিয়ে খুব শংকায় আছি। যে কোন মূহুর্তে খুন হয়ে যাব। আমি এই দেশে থাকতে চাইনা। আমি বিদেশ যেতে চাই। আপনারা আমাকে এই বিষয়ে দয়া করে সাহায্য করুন।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি