গেমিন (গে + মুমিন) দের সমীপে
রিয়াজ ওসমানী

ইসলাম ধর্মে সমকামিতা পাপ? আসুন ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখি। এখানে কোরান আর হাদিসের কথাই আসবে। প্রথমে কোরান শরিফ দিয়ে শুরু করি। এখানে লুতের ঘটনার কথা বলা আছে এবং বেশীর ভাগ মানুষ জানে যে সমকামিতার কারণে আল্লাহ এই শহর ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু এটা কি জানেন যে পশ্চিমা মুসলমানদের মধ্যে এখন ধর্মীয় গবেষণার ফলে অনেকেই এই নিয়ে বলছেন (তাদের ব্যাখ্যা সহ) যে লুত শহরকে সন্মতিসূচক (এবং/অথবা ভালবাসা দিয়ে আবৃত) সমকামিতার কারণে ধ্বংস করা হয় নি, হয়েছে পুরুষ ধর্ষণের কারণে, যা ছিল সেই শহরে প্রবল? কোন ব্যাখ্যাকে আপনি এখন বেশী প্রাধান্য দেবেন? আর যেই কারণেই ধ্বংসের কথা বলা হোক, কোরান শরিফে সমকামিদের শাস্তির কোন বিধান দেয়া নেই। কোথায় দেয়া আছে? সেটা হচ্ছে হাদিসে। আসুন তাহলে এবার হাদিস নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।

নবী (সঃ) মারা যাওয়ার দুইশত বছর পর বংশপরম্পরায় মানুষের মুখ থেকে শুনে শুনে সমগ্র হাদিস সঙ্কলিত করা হয়। এর মধ্যে অনেক হাদিসকে পরে পরষ্পর বিরোধী ও ভ্রান্তিকর বলে তখনকার ইসলাম প্রচারকরা বাতিল করে এবং যা বাকি থাকে তা আজ আলেমগন সহি হাদিস বলে গণ্য করে। তখনকার ধর্মপ্রচারকরা ছিল পুরুষ, এবং পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষের কাছে একজন স্ত্রীস্বরূপ যৌনাচারে লিপ্ত হবে এটা ছিল অভাবনীয় এবং পুরুষ জাতির জন্য অপমানজনক। কারণ নারীকে অনেক আগেরকার সময় থেকেই নিম্ন স্তরের এবং দূর্বল শ্রেনীর হিসেবে ভাবা হত (এখনও হয়)। বিষমকামী এবং সন্তান জন্মদানে সক্ষম এমন যৌনাচারে এক পুরুষ আরেক নারীকে যে “প্রবেশ” করবে, এতে পুরুষের মাহাত্ম্যই প্রমাণিত হয় এবং একটা নারীর অসহায়ত্ব পরিস্ফুটিত হয়। এক পুরুষ পায়ুকামের মাধ্যমে আরেক পুরুষ দ্বারা প্রবেশিত হবে? হারাম হারাম। এত বড় কলঙ্ক সইবে কে? পুরুষ কখনও নারীর মত অসহায় হতে পারে না।

এই ছিল সমকামিদের বিরুদ্ধে যে সকল হাদিস দু’শত বছর ধরে মানুষের মুখ থেকে শোনা যায়, সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখার যৌক্তিকতা। আর তাছাড়া চাইনিজ হুইসপার্সের কথা শুনেছেন কখনও? একটা ঘরে গোল হয়ে কিছু মানুষ বসে একটা খেলা খেলে। একজন খেলোয়ার তার ডান দিকের মানুষের কানে একটা কথা ফিস ফিস করে বলে। ডান দিকের মানুষটা তারও ডান দিকের মানুষটাকে একটু আগে শোনা কথাটা বলে। এইভাবে কথাটা ঘুরতে ঘরতে প্রথম মানুষটার বাম কানে চলে আসে। খেলার উদ্দেশ্যটা হচ্ছে একেবারে প্রথমে যেই কথাটা বলে হয়েছিল, তার সাথে শেষ বারের মত ফিস ফিস করে বলা কথাটার সাথে কতটা মিল বা পার্থক্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে প্রথম কথা আর শেষ কথার মাঝে কোন মিল নেই। একজন, একজন করে কথাটা উড়ে যাওয়ার সময়ে কথাটিতে অল্প করে হলেও কিছু ভেজাল ঢুকে পরে।

এই যুক্তিতে আপনারাই বলুন, দু’শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ভেসে আসা কথা নবীর নিজের মুখ থেকে বলা কথার তূলনায়ে কতটুকু নিখুঁত থাকতে পারে? এখানে কি জঞ্জাল আর জগাখিচুড়ি হয়ে যাবার উপক্রম তৈরী হয় নি? এর পরেও হাদিসে বিশ্বাস করবেন? তাও আবার সমকামিদের শাস্তির বিধানের হাদিসগুলো? আমি তো বলবো এই সব হাদিসের একেবারেই কোন বিশ্বাস্যতা নেই। প্রথম হচ্ছে দুইশ বছর পরের ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা এবং উদ্দেশ্য (যার মধ্যে নারী ও পুরুষকে বিবাহত্তর সন্তান প্রসব করিয়ে ধর্ম প্রচার সহজ করানোও ছিল অন্যতম)। দ্বিতীয় হচ্ছে চাইনিজ হুইসপার্সের প্রভাবটা। এবং এই কারণে ইসলাম ধর্ম যে সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করেছে এবং তার শাস্তির বিধান রেখেছে তা কখনোই এক বাক্যে বলা যাবে না। আর ডাক্তারী বিজ্ঞান অনুযায়ী সমকামিতা শুধু একটা কর্মই নয়। সমকামিতা একটা যৌন প্রবৃত্তি, যার মানে হচ্ছে একটা মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই নিজের ভেতর থেকে কোনও সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি, না কি কোনও বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি যৌনভাবে আকৃষ্ট হয়, তার প্রতি প্রেমের সম্পর্ক করার ক্ষমতা প্রদর্শন করে। প্রাণী ও মানুষের আদিকাল থেকেই এদের মধ্যে অল্প শতাংশরা এই যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যা গবেষণার ফলে প্রমাণিত যে তা পরিবর্তনীয় নয়।

গেমিন হয়ে হয়তো বিজ্ঞানের কথা শুনতেই চান না। কিন্তু আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আছেন যারা একটু শোনার ক্ষমতা রাখেন। তারা চেষ্টা করলেই বুঝতে পারবেন যে সৃষ্টিকর্তা সমকামীদেরকে এইভাবেই বানিয়েছেন। এবং তিনি যদি তাই করে থাকেন, তাহলে তিনিই আবার সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করবেন, এটা অযৌক্তিক। তাই সমকামী হওয়ার ফলে আজই আপনি পাপবোধ থেকে বের হয়ে আসুন আর অন্যান্য সমকামীদের মধ্যে ভয়-ভীতি আর অপরাধবোধ ঢোকানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। রাতের বেলা সমকামিতা করে দিনের বেলা আবার হাদিসের বয়ান দেয়া বন্ধ করুন। বাংলাদেশে সমকামীদের মানবাধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে আপনারাই সবচেয়ে বড় বিপদ সংকেত।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি