সমকামীদের অধিকার, ব্যাপক ভ্রান্তিকর ধারণা এবং ৩৭৭ ধারা
বালিকা

২৫ নভেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় সমকামিতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” অপরাধ হিসেবে এবং এর শাস্তি হিসেবে দশ বছর মেয়াদের কারাদন্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (নারী-পুরুষ / পুরুষ-পুরুষ) যদি পরস্পর সম্মতিক্রমে পায়ুকামে নিয়োজিত হয় (সমকামী বা বিষমকামী যে কেউ) সেটা ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। অর্থাৎ রাষ্ট্র আইন করে ঠিক করে দিচ্ছে যে আপনি আপনার শোয়ার ঘরে কেমন আচরণ করবেন!

সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আইন রয়েছে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে। অন্যদিকে সমকাম যে কোনো অপরাধ নয়, তা দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি করে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সে দাবির প্রেক্ষিতেই সমকামীদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি তুলে দেয়া হোক, এই মর্মে একটি প্রস্তাব আনা হয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪৭ টি দেশের মধ্যে ২৭ টি সদস্য দেশ মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ১৩টি দেশ ভোট দেয় বিপক্ষে, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে। সেই ১৩টির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। এতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে যেই দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেই দেশগুলোর মধ্যে চীন ছাড়া বাকি সবগুলোই বর্তমানে ধর্মভিত্তিক প্রতিক্রিয়াশীলদের নিয়ন্ত্রণে (আমেরিকা, ভারত, এবং সৌদি সহ অন্যান্য মুসলমান বা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ)।

সারা বিশ্বজুড়েই সমকামীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম দীর্ঘ এবং কন্টকাকীর্ণ। যুক্তরাজ্যে অ্যালান ট্যুরিং এর মত যুগশ্রেষ্ঠ কম্পিউটার বিজ্ঞানীকে সমকামিতার অপরাধে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যেতে হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের মত দেশে, যেখানে সব কিছু দেখা হয় ধর্মের চোখ দিয়ে, সেখানে সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন কাজ। আপনাদের হয়তো মনে আছে, সমকামীদের নিয়ে প্রকাশিত রূপবান পত্রিকার কুশলীদের জঙ্গিরা কি নৃশংসতার সাথে হত্যা করেছিল। সমকামিতা নিয়ে আমাদের অধিকাংশেরই ধারণা পরিষ্কার না। অনেক ভুল ধারণা লালন করি আমরা অনেকেই। পিএইচডি ধারী থেকে বকলম মূর্খ, এমনকি অনেক চিকিৎসকও এই ভুল বিদ্যা লালন করে থাকে। যার ফলেই সমকামিতাকে আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় (তবে বাংলাদেশের আইনে এই ক্ষেত্রে দশ বছর কারাদন্ডের বিধান রয়েছে, মৃত্যুদন্ড না)।

কয়েকটি বিষয় মাথার মধ্যে গেঁথে নিলেই এই ভুল চিন্তাগুলো আর থাকবেনা। ১) কেউ চাইলেই সমকামী হয়ে যেতে পারে না। আবার কোন সমকামী চাইলেই বিষমকামী (আপনারা যেটাকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন সেটা) হয়ে যেতে পারে না। এটা পুরোপুরি একটা জন্মগত বৈশিষ্ট্য বা যৌন প্রবৃত্তি। কাউকে জোর করে সমকামী বানানো সম্ভব নয়, আবার সমকামীদের 'স্বাভাবিক' (যদিও সমকামীতাও স্বাভাবিক) বানানো সম্ভব নয়। ২) সমকামীতা কোন রোগ নয় যা চিকিৎসা করে সারিয়ে তোলা যায়। আগে এটাকে মানসিক রোগ হিসেবে মনে করা হত। কিন্তু ক্রমাগত গবেষণায় প্রমাণীত হয়েছে যে এটা কোন রোগ নয়। ৩) সমকামীতা কোন বিকৃতি নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। বিবর্তনের ধারায় স্বাভাবিক ভাবেই এদের সংখ্যা কম, কিন্তু এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কোন ঘটনা নয়। একজন বিষমকামী মানুষ যেমন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, একজন সমকামী তেমনি সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। তাছাড়া মানুষ ছাড়াও প্রকৃতিতে আরও অনেক প্রাণীর মধ্যে সমকামিতার প্রবণতা দেখা যায়, মানুষের থেকে বেশিই দেখা যায়।

৪) সমকামীদের অধিকার দিলেই সবাই দলে দলে সমকামী হয়ে যাবে ব্যাপারটা হাস্যকর। আগেই বলেছি, কাউকে জোর করে সমকামী বানানো যায় না। যে সমকামী সে অধিকার দিলেও সমকামী, না দিলেও সমকামী। পার্থক্য এই যে, অধিকার দিলে সে প্রকাশ্যে স্বাভাবিকভাবে সঙ্গীর সাথে বসবাস করতে পারবে, এখন বাস করে লুকিয়ে। অনেক সময় পরিবার এবং সমাজের চাপে বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে বিয়ে করতে বাধ্য হয় এবং নিজের আর যার সাথে বিয়ে হল তার জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

সমকামীদের অধিকার-দান বলতে আমরা বুঝি তাদেরকে তাদের মত করে থাকতে দেয়া। অধিকার দিলেই তারা আপনাকে ধরে সমকামী বানিয়ে দেবে, ব্যাপারটা একেবারেই বাস্তব নয়। বরঞ্চ অধিকার দিলে সমাজে স্বাভাবিকভাবে তাদের বাস করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্র নাগরিকদের কামরায়ে পাহারা দিতে না পারলেও, তারা সেখানে কি আচরণ করবে সেটা আইন করে বর্তমানে ঠিক করে দেয়! সভ্য রাষ্ট্র কখনো নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চিন্তিত হতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত কারও কর্মকাণ্ডে অন্য কারও ক্ষতি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই। অথচ সমকামিতার মত একটি স্বাভাবিক এবং একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারকে আমরা মনে করি 'মৃত্যুদণ্ড' পাবার মত অপরাধ!

আমি জানি, আমাদের মত দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে সমকামীদের অধিকার আদায় আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম, যারা পড়াশোনা করে, পৃথিবীর খোঁজ খবর রাখে, যারা সংবেদনশীল - তারা যদি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সমকামীদের স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করে, তাহলে আইনে যাই-ই থাকুক না কেন, মানুষের অধিকার আদায় অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি