অব্যক্ত কথামালা
কথাকলি

অব্যাক্ত কথাগুলো ব্যাক্ত করা বৈকি। আর কিছু না।

মনের মধ্যে অনেক কথা লুকিয়ে ছিল। অনেক কষ্ট, বেদনা মনে বিরাজমান ছিল। তাই সেগুলো লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা, এর বেশী আর কিছু না।

আমার যখন জন্ম হয়, তখন আকাশটা অনেকটা নীল রঙের ছিল। তাই নাম রাখা হল নীল। কিন্ত জীবনটা সম্পূর্ন রঙ হীন হবে, সেটা হয়তো কেউ কোন দিন ভাবেনি। ছোট থেকেই আমি দেখতে অনেকটা সুন্দর আর ফুটফুটে ছিলাম। অনেকটা দুষ্ট প্রকৃতিরও ছিলাম বটে। কিন্তু এখন আর সেরকমটা নেই। জীবনটা অনেকটাই সাদাকালো ছবির মত হয়ে গিয়েছে।

আম্মুর মুখে শোনা –

ছোট কালে আমি ছেলে-মেয়ে সবার সাথে মিশতাম। কিন্তু মেয়েদের সাথে মেশার হার ছিল বেশী। কারন আমার চাচাতো ভাইদের তুলনায় বোনদের সংখ্যাই ছিল বেশী। তাই বোনদের সাথেই মিলে মিশে ছোট থেকে বড় হওয়া। বোনদের সাথেই পুতুল খেলা, ক্রিকেট খেলা, বৌচি খেলা, গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলা খেলতাম।

আমার আব্বু-আম্মু দু’জনেরই খুব ইচ্ছা ছিল ছেলেকে মাদ্রাসা লাইনে পড়ানোর। কিন্তু তাদের আদরের ছেলের যে কখনোই এই লাইনে পড়তে মন বসবে না, সেটা হয়তো বুঝতে পেরেছিল। তাই কয়েক মাস মাদ্রাসায় পড়ানোর পর বাড়ির পাসে এক কিন্টার কার্ডেনে ভর্তি করিয়ে দিল।

আমি লেখাপড়ায় মোটামোটি ভালোই ছিলাম। আমি আর আমার বোন প্রতিদিন একসাথে স্কুলে যেতাম। স্কুলে ছেলে বন্ধুদের থেকে মেয়ে বন্ধুদের পরিমানই ছিল বেশী। কেন জানি না, ছেলেদের থেকে মেয়েদের সাথেই আমার মিশতে বেশী ভালো লাগতো। লেখাপড়া, খেলাধুলা, আম্মুর শাসন-বকুনী, এভাবেই আমি বড় হতে শুরু করলাম।

আমার বোন ছিল আমার থেকে দু’বছরের ছোট। ছোট বলেই আমি আমার বোনের সাথে অনেক ঝগড়া করতাম। করতাম বললে ভুল হবে। কারন এখনো আমি ওর সাথে ঝগড়া করি।

বাড়ীর সবাই আমাকে খুব ভালবাসতো। এখনো ভালবাসে। আমি আমার দাদাভাইয়ের দুই নয়নের মনি ছিলাম। ছোট বেলা আমি দেখতে অনেকটাই নাদুস-নুদুস ছিলাম। আমাদের বাড়ির পাশে আমার এক প্রতিবেশী মামা ছিল। উনার বয়স তখন ২৪ কি ২৫ হবে। আর আমার ছিল তখন ১২ বছর। ছোট থেকেই উনাকে আমি মামা বলে ডাকতাম। উনি মাঝে মাঝেই আমার বাড়ী আসতো। আমিও যেতাম তাদের বাড়ী ঘুড়তে। আমাকে যখন উনি একা পেতো, তখনই আমার শরীরে, গালে টিপে দিত যেটা আমার এক রকম অসহ্য লাগতো।

একদিন বিকাল বেলা আমার আব্বু উনাকে ডেকে আনার জন্য আমাকে তার বাড়ী যেতে বললো। তাই আমি সেই মামার বাসায় গেলাম। বাসায় গিয়ে দেখি কেউ নেই উনি ছাড়া। আমাকে দেখে উনি উনার ঘরে আসতে বলে। আমিও উনার ঘরে যাই। উনি আমাকে উনার খাটের উপর বসতে বলে। আমিও উনার কথা শুনে খাটের উপর গিয়ে বসি।

উনিও খাটের উপর এসে আমার পাশে বসে। কথা বলতে বলতে এক সময় মামা আমার গায়ের উপর এসে পড়ে। আর জোড় করে আমাকে খাটের উপর শুইয়ে দেয়। তার পুরো শরীর আমার উপর। আমি ছটফট করতে শুরু করলাম চলে আসার জন্য। উনি আমাকে বলেঃ “এরকম করছো কেন? বাসায় তো কেউ নেই। আজকে তোমাকে অনেক আদর করবো”।

আমি ভাবতে লাগলাম কেউ নেই মানে কি? উনি আমার সাথে কি করতে যাচ্ছে যেখানে কেউ থাকলে সমস্যা আছে। আমি বললামঃ “মানে? এভাবে আবার কিসের আদর করে?”। আমাকে তো অনেকেই আদর করে, ভালবাসে। কেউ তো আর উনার মত এরকম করে না।

উনি আস্তে আস্তে আমার সব কাপড় খুলে ফেললো। আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। আর বার বার উনার নিচ থেকে আমি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমি কিছুতেই পারছিলাম না। উনি আমার শরীরটাকে ময়দার মত টিপতে শুরু করলো। আর এই দিকে আমার দমটা বন্ধ হয়ে আসছিল। একটা সময় উনিও নিজের কাপড় খুলতে শুর করল। আমি বললামঃ “ছি ছি ছি মামা, আপনি এসব কি শুরু করেছেন!”।

উনি কিচ্ছু বললো না। উনি রীতিমত আমার শরীরটাকে নিয়ে খেলা করেই যাচ্ছে। আমি উনার লৌহদন্ডটা লক্ষ করতে পারলাম। একদম লোহার মত শক্ত আকার ধারন করেছিল সেটা। উনি উনার লৌহদন্ডটি দিয়ে আমার তলদেশ আস্তে আস্তে আঘাত করা শুরু করলো। আর আমি চিৎকার, কান্নাকাটি শুরু করলাম। কিন্তু কেউ আমার চিৎকার শুনতে পেলো না। কেউ আমার কষ্টটা অনুভব করতে পারলো না। টানা ২০ মিনিট আমার সাথে এই অত্যাচার করা হল। আর এই দিকে আমার তলদেশ রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেলো। পরে আমি কান্না করতে করতে মামার বাড়ী থেকে আমার বাসায় চলে আসি। কিন্তু বাড়ীর কাউকে এসব কথা বলতে পারিনি। প্রায় ৪/৫ দিন আমার শরীর ব্যাথা করেছিলো। সেই থেকে আমি আমার সেই মামার সামনে কখনো ভয়ে যেতাম না। লজ্জায় কখনো তার সামনে দাড়াতাম না।

আমি তখন এসবের কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু এখন ভাবি, কোনো একটা ১২ বছরের কিশোরের সাথে একজন পরিপূর্ন যুবক এই কাজটি করেছিল। কিন্তু মামাটার বউ ছিল। বউ থাকা সত্যেও কিভাবে উনি আমার সাথে এই কাজটি করেছিল? আমি শুনেছি উভকামীরা ছেলে-মেয়ে উভয়ই পছন্দ করে। কিন্তু ঐ মামাটা যে উভকামী ছিল, সে তো কখনো শুনিনি বা দেখিনি। নাকি উনার বউ বাড়ী ছিল না বলে আমার উপর উনার কাম শক্তিকে অর্পন করেছিলো। এখনো মনের মধ্যে এই সব প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে।

আমার বয়স যখন ১৫ তে পা দিল, তখন আমি আমার নিজের মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ করতে পারলাম। আমার মনের মধ্যে ছেলেদের প্রতি এক দূর্বলতা কাজ করতো। ছেলেদেরকে আমার অনেক ভাল লাগতো। কিন্তু কেন এরকমটা হত, সেটা আমি বুঝতাম না। যখন আমি নবম শ্রেনীতে পড়তাম, তখন একটা ছেলেকে আমি অনেক ভালবাসতাম। ছেলেটির নাম ছিল অর্নব। অর্নব আমার দুই ক্লাশ উপরে পড়তো। আমরা এক সাথে ঘুড়তে যেতাম, দিনের বেশির ভাগ সময়টাই দুইজনের এক সাথে কাটতো। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে যেমন প্রেম করতো, আমরাও সেই রকম প্রেম করতাম। অর্নব আমাকে অনেক সপ্ন দেখাতো। আর আমিও সপ্ন দেখতাম। কিন্তু কখনো আমি ভাবতাম না যে আমি ছেলে নই, মেয়ে। অর্নব মাঝে মাঝেই আমাকে বলতোঃ “আমি কখনো বিয়ে করবো না। তোমাকে নিয়ে সারা জীবন থাকবো”। আমিও ভাবতাম যে সারা জীবন আমরা স্বামী-স্ত্রীর মত থাকবো।

আমি তখন যৌনতা সম্পর্কে সব কিছু বুঝতাম না। বুঝতাম বললে ভুল হবে। অর্নব আমাকে সব কিছু বুঝিয়েছে। আমার মনের মধ্যে সব সময় ছেলেদের প্রতি এক ভালবাসা কাজ করতো কিন্তু কখনো সেক্স কিংবা যৌন সম্পর্ক বুঝতাম না। অর্নব আর আমি প্রায়ই এক সাথে রাতে থাকতাম। প্রতি রাতেই অর্নব আমার সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হত। আমারও ভাল লাগতো কিন্তু মাঝে মাঝে খারাপও লাগতো। কিন্তু তখনও আমি বুঝতাম না যে এটাকেই সমকামিতা বলে। আস্তে আস্তে আমি অর্নবকে অনেক ভালবাসতে শুরু করলাম। একদিন অর্নবকে না দেখলে ভাল লাগতো না। কোনো মেয়ে যখন অর সাথে কথা বলতো, তখন আমার অনেক রাগ হত। এসব ব্যাপার নিয়ে মাঝে মধ্যে ওর সাথে আমার ঝগড়াও হত।

আমি যখন দশম শ্রেনীতে উঠলাম, তখন অর্নব উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করলো। তাই সে ঢাকা যাবে পড়াশোনার জন্য। খবরটা শুনে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম অর্নবের ঢাকা যাওয়ার খবরটা শুনে। আমার সব সময়ে মনে হচ্ছিল যে আমার ভালবাসার মানুষটাকে মনে হয় আমি হারিয়ে ফেলছি। কিন্তু ঢাকা চলে যাওয়ার ব্যাপারে অর্নবকে অনেক খুশি খুশিই লাগছিল। আমাকে নিয়ে মনের মধ্যে তার কোন চিন্তা পর্যন্তই ছিল না। ঢাকা চলে যাওয়ার আনন্দতেই সে মসগুল ছিল। অবশেষে অর্নব ঢাকা চলে গেলো। আর অর্নবের চিন্তায় এই দিকে আমার লেখাপড়ার অবস্থা খুব খারাপ হতে শুরু করলো। ঢাকা যাওয়ার পর অর্নব মাঝে মধ্যে আমাকে ফোন করতো। আমি ফোনের মধ্যে শুধু কান্নাকাটি করতাম। কিন্তু অর্নব শুধু ফোনের মধ্যে হাসতো আর আমাকে পাগল বলতো।

আমার মনের মধ্যে যে কষ্ট, না পাওয়ার যে যন্ত্রনাটা, ওর জন্য বুকের মধ্যে যে ভালবাসাটা, সেটা কখনো বুঝতো না। আমি একা একা সেই ইট দিয়ে বাধানো পুকুরের ঘাটে বসে থাকি। সবই সেই আগের মতই আছে। পুকুরে হাঁসগুলো সাতার কাটছে, এক কোনে লাল শাপলা ফুটে আছেল। ঘাটের পাশে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে শিউলি ফুলের গাছ। কিন্তু আমার পাশে শুধু নেই অর্নব। অর্নবহীন জীবনটা নিয়ে আর বেচে থাকতে ইচ্ছা করছিলো না।

ঢাকায় চলে যাওয়ার পর অর্নব সম্পুর্নই পরিবর্তিত হয়ে গেলো। যেই অর্নব মাঝে মধ্যে ফোন দিতো, সেই অর্নব এখন সেটাও করে না। মাস শেষে যখন বাড়ী থেকে আনা টাকা শেষ হয়ে যেতো, তখন শুধু ফোন দিতো। কখনো সরাসরি টাকা চাইতো না। কিন্তু ভাবে বোঝাতো যে টাকার সমস্যায় আছে। অর্নব খুব ভাল করে জানতো যে তার যে কোন সমস্যায় নীল কখনোই চুপ থাকবে না। তাই আম্মুর ব্যাগ থেকে, আব্বুর পকেট থেকে টাকা চুরি করে অর্নবকে বিকাশের মাধ্যমে পাঠাতাম। অনেক বার টাকা চুরি করতে গিয়ে আম্মুর হাতে মার পর্যন্তও খেয়েছি।

এই অর্নব সেই আগের অর্নব নেই। মনে হয় যেন অন্য অর্নব। যে অর্নব আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বিভিন্ন স্বপ্ন দেখাতো, দিনের পর দিন আমার পাশে পাশেই থাকতো, আমাকে ভালবাসতো, রাতের পার রাত আমার সাথে কাটাতো, আজ সেই অর্নবের কাছে আমি সবার মতোই সাধারন এক বন্ধু। আগে বলতো আমি ওর প্রান পাখি, কলিজার টুকরা – কত্ত কিছু। আর এখন ফোন করে বলে আমি নাকি ওর বন্ধু। কিন্তু আমি তো কখনোই ওকে বন্ধু ভাবতাম না। আমি অর্নবকে আমার জীবনের এক অংশ ভাবতাম। একদিন অর্নব ফোনের মধ্যে আমাকে বলছে যে কোন এক মেয়ের সাথে নাকি ও সম্পর্কে গিয়েছে।

সেই দিন আমি শুধু চুপ করে এই কথাটা শুনলাম আর বুক ফেটে যাওয়া কষ্ট নিয়ে চোখের পানি ফেলেছিলাম। আগের মত কখনোই কোন ঝগড়া করতাম না। শুধু ফোনের মধ্যে হাসতাম, কিন্তু সেটা হাসি ছিল না। ছিল শুধু হাসির অভিনয়। অর্নব কখনোই বুঝতো না যে এই হাসির পেছনে অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে। প্রেমিকাকে ভালবাসা দিবসে উপহার দিবে, অর্নবের কাছে টাকা নেই। তাই অর্নবের মন খুব খারাপ ছিল। আমাকে ফোন করে এই সম্পর্কেই বলেছিল। তখন আমার কাছে টাকা ছিল। ঐ দিকে টাকার অভাবে সে কষ্টে আছে। আর এই দিকে আমি হাতে টাকা নিয়ে বসে থাকবো। সেটা তো কখনো হতে পারে না। আমি বিকাশ করে কিছু টাকা অর্নবের কাছে পাঠিয়ে দিলাম।

আমার টাকা দিয়ে অর্নব তার প্রেমিকাকে উপহার কিনে দিলো ভালবাসা দিবসে। আর আমি উপহার পেলাম বুক ভরা কষ্ট। আমার খুব রাগ হলো সৃষ্টিকর্তার উপর। কেনো আমাকে উনি মেয়ে হিসেবে দুনিয়ায় পাঠালেন না। তাহলে হয়তো অর্নবকে আমি আমার করে পেতাম। ঐ দিকে অর্নব একটা মেয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছে। আর অন্য দিকে আমি অর্নবের দেখানো মিথ্যা স্বপ্নগুলো নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতাম।

আস্তে আস্তে অর্নব আমার সাথে ফোনে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। আর আমাদের মধ্যে এক বিশাল দূরত্বের সৃষ্টি হলো। আমি বুঝতে পারলাম যে আমার অর্নব আর কোন দিনও আমার কাছে ফিরে আসবে না। অর্নবের দেখানো স্বপ্নগুলো শুধু স্বপ্নই রয়ে যাবে। সেটা কখনোই বাস্তব রূপে পরিনত হবে না। আমার কিছু বুঝতে আর বাকি রইলো না যে এসব কিছু ছিলো অর্নবের অভিনয়। ওর দেখানো ভালবাসা ছিল একটা বাহানা। আমার শরীরটা পাওয়ার জন্যই অর্নব এতো দিন আমার সাথে ভালবাসার অভিনয় করে গিয়েছে।

আমার মনের থেকে কি শরীরের দাম অর্নবের কাছে অনেক বেশী ছিল? আমি তো কোন স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিলাম না। তাহলে কেনো অর্নব আমাকে মিথ্যা স্বপ্প দেখিয়েছে? আমি তো আর ওর মত করে ওর শরীরটাকে ভালবাসতাম না। তাহলে কেনো ও আমার সাথে এরকমটা করলো? আমার এই জীবনের কি কোনই মূল্য নেই? আমি কি শুধু ভোগের বস্তু? কার কাছে আমি আমার এই সব প্রশ্নের উত্তর চাইবো? আমি কি কাঠের পুতুল? যে যেরকমটা চাইবে সে আমাকে নিয়ে সেরমকমটাই করবে?

আমি আস্তে আস্তে অর্নবের সব স্মৃতি ভুলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। কিন্তু সময় তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না। তাই মনের বিরূদ্ধে গিয়ে আমি অর্নবকে ভুলতে শুরু করলাম। কিন্তু ভুলতে চাইলেই কি সব ভোলা যায়?

এস এস সি শেষ করার পর আমিও ঢাকা চলে আসি। আর ঢাকায় আসার পর আমি সমকামিতা সম্পর্কে আরো ভালভাবে জানা শুরু করলাম। এন্ড্রোয়েড মোবাইল কিনে ফেসবুক ব্যাবহার করতে লাগলাম। ফেসবুক ব্যাবহারের মাধ্যমে আমি আমার মত অনেক সমকামী বন্ধুদের খোঁজ পেলাম এবং তাদের সাথে বন্ধুত্ব করলাম।

আমি এখন আর একা নই। আমার অনেক বন্ধু আছে। যাদের কাছে আমি আমার মনের সব কথাগুলো খুলে বলতে পারি। যারা প্রতিনিয়ত আমার পাশে থাকে। সবার জীবনে ভাল মনের বন্ধু থাকলে আর কাউকেই প্রয়োজন হয় না। তবে মনের মধ্যে একটা না পাওয়া ভালবাসার আকাঙ্ক্ষা থেকেই থাকে। আমি বা আমার মত মানুষের অধিকার নেই কাউকে ভালবাসার। কাউকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার। কিন্তু কেনো?

আমি ছেলে বলে? ভালবাসাতো আর লিঙ্গ বিবেচনা করে হয়ে না। ভালবাসা জিনিষটা তো মন থেকে অনুধাবিত হয়। তাহলে কেনো আমার ক্ষেত্রে এতো বিধি নিষেধ? যদি ভালবাসতে নাই পারো, তাহলে স্বপ্ন দেখাতে আসো কেনো? শুধু শরীরটা পাওয়ার জন্যই কি এতো কিছু? একটা ছেলে আর একটা মেয়ে প্রেম করতে পারে। পরবর্তিতে তারা বিয়ের মাধ্যমে ছুটিতে আবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু আমি কেন পারবো না?

মেনে নিলাম আমি ছেলে বলে অন্য কোন ছেলের সাথে সারা জীবন থাকতে পারবো না। কিন্তু সবাই আমার সাথে কেনো ভালবাসার অভিনয় করে? সারা জীবন পাশে থাকবে বলে কেন মিথ্যা স্বপ্ন দেখাতে আসে? একটা ছেলেকে সঙ্গ দিতে তো আর মেয়ের অভাব হয় না। তাহলে কেনো আমার শরীরের সাথে একটা সময় পর্যন্ত খেলা করে ছেড়া কাগজের মতো টুকরো টুকরো করে ফেলে দেয়?

আমি সমকামী বলে? সবার মত সমকামীদেরও তো হাত, পা, চোখ, কান সবই আছে। ভালবাসার জন্য আছে সুন্দর একটা মন। তাহলে কেনো এমনটা হয়? সমকামীরা কি মানুষ না? তারা কি শুধু সবার দেহের চাহিদা পূরনের জন্যই এই দুনিয়ায় জন্মগ্রহন করেছে? এই সব প্রশ্ন কি সব সময় আমার মনের মধ্যে প্রশ্নই রয়ে যাবে? এর উত্তর কি আমি কোন দিনও খুঁজে পাবো না?

আমাদের সমাজে সমকামীদের প্রতিনিয়ত অবহেলা আর ঘৃণা করা হয়। একটা পশুর প্রতি মানুষের যেটুকু ভালবাসা থাকে, একটা সমকামীর প্রতিও সেইটুকু ভালবাসা থাকে না। কিন্তু কেনো? শুনেছি মানুষ নাকি সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু কোথাও তো কিছু লেখা নেই যে সমকামী ব্যাতীত সকল মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব!!

সমাজ থেকে আমাদের আলাদা করে দেখা হয়। আমরাও তো কোন না কোন মায়ের গর্ভ থেকেই এই পৃথিবীতে জম্নগ্রহন করেছি। কোন পশুর গর্ভ থেকে বা মাটি ফেটে তো আর এই পৃথিবীতে আমরা আসিনি। আমাদেরও তো বেচে থাকার অধিকার আছে।

কেউ তো আর ইচ্ছা করে সমকামীতে পরিনত হয় না। তাহলে কেন সমকামীদের প্রতি এতো অবমাননা? আমরা তো কোন পাপ করিনি। সমকামী হওয়াটা যদি আমার অন্যায় হয় তাহলে সেক্ষেত্রে আমার তো কোন দোষ নেই। দোষ যদি কারোর থেকেই থাকে তাহলে সেটা হলো একমাত্র ঈশ্বরের। কারন ঈশ্বরই আমাকে সমকামী হিসেবে দুনিয়াতে প্রেরন করেছেন। তাহলে কেন সবাই আমাকে দোষী বা খারাপ বলবে?

সমকামীরা না কি প্রকৃতি বিরূদ্ধ কাজ করে। কিন্তু আমার কাছে এই কথাটা শুনলে অনেক হাসি পায়। যারা বোকা, তারাই এই মন্তব্য করে থাকে। কারন যে প্রকৃতিতেই আমরা ছোট থেকে বড় হই, যে প্রকৃতিই আমাদের দেখিয়ে দেয় যে আমরা সমকামী, তাহলে সমকামীরা কিভাবে প্রকৃতি বিরূদ্ধ কাজ করে? আবার অনেকেই বলে সমকামিতা নাকি পশ্চীমাদের থেকে সৃষ্ট। কাঠমোল্লারা তো গালি দিয়েই খালাস। এমনকি প্রগতিশীলদের মধ্যেও রয়েছে নানা রকমের আপত্তি। কিন্তু সমকামিতা তো সৃষ্টিলগ্ন থেকেই হয়ে আসছে। তাহলে এই আধুনিক সভ্যতায় এসে কেনো সমকামীদের সম্পর্কে সবার মনে এরকম বিভ্রান্তিকর ধারনা? সমকামীরা তো আর সমাজের বোঝা নয়। সমকামীরাও লেখাপড়া করে দেশের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের জন্য অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড করে থাকে। কিন্তু আমাদের সমাজের মানুষগুলো শুধু সমকামীদের সুবিধাই ভোগ করে জানে। সমকামীদের সর্বোচ্চ সন্মানের কথা না হয় বাদই দিলাম, তাদের মানুষ বলেও গন্য করা হয় না।

আমাদের সমাজের এমন কিছু পশুসুলভ লোক আছে যারা সমকামী দেখলেই নাক সিটকানো শুরু করে। যেমনটা রাস্তায় বা ডাস্টবিনের আবর্জনা দেখলে সবাই করে থাকে। সেই সব মানুষদের আমার মানুষ ভাবতে ঘেন্না লাগে। যে এক জন মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে সন্মান দিতে জানে না, সে পশুর থেকেও অধম।
যাই হোক, “যেই লাউ সেই কদু”। যতই গলাবাজী করি না কেনো, যেরকমটা সেরকমই রয়ে যাবে। কোন দিনও আমাদের সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না, বিশেষ করে আমাদের এই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। তবুও স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখতে তো আর দোষ নেই। আমার মনটা তো আর কারোর বাপ-দাদার সম্পত্তি না যে স্বপ্ন দেখতে অনুমতি লাগবে।

সকল প্রতিকূলতার মাঝেও এখনো স্বপ্ন দেখি যে আমরাও এক দিন সমাজের বুকে, এই দেশের বুকে মাথা উচু করে নিজের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকবো।

সম্পাদকের মন্তব্যঃ

সমকামিতা এবং উভকামিতার অধিকার প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতি যেখানে আছে সেখানেই প্রযোজ্য। এ'দুটো ব্যাপার শিশুকামিতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং শিশুকামিতাকে কঠোর ভাবে বর্জন এবং রোধ করতে হবে যেহেতু একজন শিশুর পক্ষে সম্মতি দেয়া সম্ভব নয়। বলাবাহুল্য শিশুকামিতা আর ধর্ষনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি