সমকামিতা একটি মানসিক রোগ - একটি উত্তর
রিয়াজ ওসমানী

২১ অক্টোবর ২০১৮



গত ১৯শে সেপ্টেম্বরে পরিবর্তন পত্রিকায় মোঃ কামরুজ্জামান নামের এক পাঠকের লিখিত “সমকামিতা একটা মানসিক রোগ” নামক একটি প্রচ্ছদ প্রকাশিত হয়। সমকামিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুরুতেই তিনি যেই শব্দ দু’টো ব্যবহার করেছেন, সেগুলো তিনি কোথায় আবিষ্কার করেছেন? Uranism (ইউরানিজম) এবং sexual inversion (সেক্সুয়াল ইনভারশন) শুব্দগুলো তো প্রচলিত ইংরেজী ভাষায়ে ব্যবহার করা হয় না? প্রথম শব্দটা বহু পুরানো গ্রীক এবং পরে জার্মান একটা শব্দ যেটা দিয়ে পুরুষ সমকামিতাকে বুঝানো হত। আর পরের শব্দটা দিয়ে ১৯শ এবং ২০শ শতাব্দীতে সমকামিতাকে বুঝানো হত, তবে সেখানে অর্থ বোঝানো হত লিঙ্গ ভিত্তিক আচরণের বিপরীতমুখী পরিবর্তন। তিনি কি তার এই লেখা দিয়ে আমাদেরকে তার বয়স জানাতে চেয়েছেন? যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে জ্ঞান অর্জন করার সময়ে তিনি কি ২০০ বছর পুরানো একটা গ্রন্থাগারে গিয়ে বই হাতাহাতি করেছেন? বর্তমান যুগে জ্ঞানকে হালনাগাদ করার জন্য যে সকল আধুনিক পদ্ধতি আছে (যেমন আন্তর্জাল), তার নামও কি তিনি শুনেন নি? সমকামী পুরুষকে যে Nancy (ন্যান্সি) বলে হয়, সেটাতো ইংরেজী ভাষার একটা দেশে থেকেও আমি কখনও শুনিনি?

তিনি বড় বড় গলায় বললেনঃ “পৃথিবী সৃষ্টি অবধি আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি যে, একটা পুরুষ কুকুর আরেকটা পুরুষ কুকুরের সাথে সমকামিতা করতে”। প্রাণী জগতে যে সমকামিতা প্রবল তা তার প্রসারিত গবেষণায়ে বের হয়ে আসেনি। পরিতাপের আসল বিষয় সেই খানেই, অন্য খানে না। তারপর তিনি গাছপালার প্রজনন নিয়ে যেই উক্তিগুলো করলেন, তাতে বোঝা যায় যে তিনিও সনাতন এবং ধার্মিক চিন্তাভাবনা অনুযায়ী মনে করেন যে যৌন মিলনের একটা মাত্র উদ্দেশ্য বাচ্চা পয়দা করা। হয়তো তার জীবনে তাই ছিল ব্যাপারটা। যৌন মিলনের আনন্দ তিনি কখনই পান নি। এত অল্প জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা নিয়ে খাতা কলম নিয়ে না বসলেই ভাল, কারণ অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। সমকামিতাকে “অসুস্থ, জঘন্য, চির জাহেলি, নোংরামি এবং অরুচি ও কুরুচিতা” বলার আগে লেখককে উল্লেখিত গ্রন্থাগার থেকে বের হয়ে আসার জন্য অনুরোধ করছি।

প্রাণী ও মানব সৃষ্টির আদিকাল থেকেই অল্প কিছু সংখ্যক প্রাণী এবং মানুষদের মধ্যে সমকামিতা নামক যৌন প্রবৃত্তিটা রয়েছে বিদ্যমান। এটার কারণ বিজ্ঞানীরা এখনও সঠিকভাবে নির্ণয় করতে না পারলেও এটা পরিষ্কার যে এটাই ছিল প্রকৃতির নিয়ম। এই নিয়ম অনুযায়ী প্রথিবীর ৫-১০% মানুষ সমকামী (এদের মধ্যে কেউ কেউ উভকামী)। বিশ্বের আর সব দেশের মত ভারতেও তাই, বাংলাদেশেও তাই। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সেরা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো অনেক আগেই গবেষণা করে ঘোষণা দিয়েছে যে বিষমকামিতার মত সমকামিতাও একটা স্বাভাবিক যৌন প্রবৃত্তি যা পৃথিবীর অল্প কিছু মানুষদের জন্য প্রযোজ্য এবং সেটা তাদের স্বত্বারই স্বরূপ। এটা কোন শারীরিক বা মানসিক রোগের আওতায়ে পড়ে না এবং এটা চিকিৎসা বা অন্য কোনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাদের এই গবেষণা লেখকের বিভিন্ন প্যাঁচালের চেয়ে অনেক তথ্য এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক। আর পশ্চিমা সরকার কতৃপক্ষ এগুলো জেনে ও মেনে নেয়ার পর সেই সব দেশে সমকামিদের বিরুদ্ধ সকল আইন ও বিধি উঠিয়ে দিয়ে সকল নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে।

ভারতও আজ একটা দীর্ঘ আন্দোলনের পর একটা আদর্শ গনতান্ত্রিক দেশের আরেকটু কাছে এসে পৌছলো সেই দেশের যৌন সংখ্যালঘুদের একান্ত যৌন ক্রিয়া ও ভালবাসাকে অপরাধ হিসেবে আর চিহ্নিত না করে। বলা বাহুল্য যে বিলেতিরা আসার আগে ভারত উপমহাদেশে এইগুলোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হত না এবং বিলেতিরাও অনেক আগে তাদের দেশে এই সকল অন্যায় বিধি উঠিয়ে দিয়েছে। লেখক কোন্ জিনিষটাকে ভয় পেয়ে এইভাবে বললেনঃ “আমি বলি, এটা শুধু অপরাধই নয়, বরং ভয়াবহ অপরাধ। আমি আরো মনে করি, এটি অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক, নৈতিকতাবর্জিত কর্মকাণ্ড, সামাজিক অবক্ষয়ের নামান্তর। সুতারাং যে কর্মকাণ্ড- ক্রিয়াকলাপ অসুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক, নৈতিকতাবর্জিত, অমানুষের কসুর, সেটাই অপরাধ।”??

কেউ কি তার সাথে সমকামিতা করতে এসেছে? জোর করে ধর্ষণ করেছে? না কি তিনি নিজেই একজন সুপ্ত সমকামী এবং নিজের এই পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না? তিনি কি এটা জানেন না যে একজন বিষমকামীকে কখনই জোর করে সমকামী বানানো যায় না এবং ঠিক এর উলটাটাও সত্যি? যার জন্ম যেই যৌন প্রবৃত্তি দিয়ে তার সেটাই থেকে যাবে আজীবন। এখানে কোন তারল্য নেই, পরিবর্তন নেই, পরিবেশগত কারণ নেই (অন্তত সর্ব শেষ গবেষণায়ে তার কোন আভাস পাওয়া যায় নি)। “সৃষ্টির সৌন্দর্য স্ত্রীলিঙ্গ এবং পুংলিঙ্গের সোহাগ মিলন ভালোবাসায় প্রস্ফুটিত হয়, বিচ্ছুরিত হয়। পক্ষান্তরে এই সমকামিতা এই সৌন্দর্য্যের অবমানকারী কিংবা শ্রী-নিঃশেষক।“ – এই কথা বলে তিনি আবারও যৌন মিলনকে শুধু বাচ্চা পয়দা করার একটা উপকরণ হিসেবে দেখছেন। প্রাকৃতিক কারণে যে সকল বিবাহিত নারী ও পুরুষ বাচ্চা নিতে অক্ষম (বন্ধ্যা), তারা কি বাকিটা জীবন একসাথে সহবাস করা বন্ধ করে দেবেন? নাকি একজন আরেকজনকে ভালবেসে যৌন মিলনে আবদ্ধ থাকতে পারবেন একজন আরেকজনকে আনন্দ দিতে? আর তিনি যেহেতু ২০০ বছর পুরানো বইপত্রই ঘাটাঘাটি করেন, নিশ্চয়ই তিনি এটা জানতে পারেননি যে আধুনিক কিন্তু ব্যয়বহুল উপায়ে সমকামী ব্যক্তি এবং সমকামী দম্পতিরাও এখন বাচ্চা নিতে পারে।

সম-অধিকারের প্রশ্নে এই বিজ্ঞ লিখেছেনঃ “মানুষ যখন পশুর চেয়েও অধম কিংবা অমানুষ হয় তখন আবার কীসের অধিকার? মানুষ যখন পশু কিংবা অমানুষ হয়ে যায় তখন তার উপযুক্ত শিক্ষার প্রয়োজন।“ এটার উত্তর যে কতভাবে দেয়া যায় জানা নেই। তবে এইটুকু এখন বলবো, যে আমাদের দেশে নতুন আইন পাশ করে বিপরীত লিঙ্গের কারও সাথে যৌন মিলন অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করে দেয়া হলে তার নিজের অধিকার খর্ব নিয়ে তার চিল্লাফাল্লা শুনতে শুনতে অন্তত আমার কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। মানবাধীকারের ‘ম’ এর ধারণা তার মত রামপাঠারই নেই বলে মনে হচ্ছে।

তিনি শেষে বলেনঃ “ভারতে সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়ার পর গুঞ্জন উঠে বিচারক ব্রাঞ্চে যারা ছিল তারা নাকি সমকামী”। কই, আমি তো এমন কিছু শুনিনি বা পড়িনি। আর সেটার বাধ্যবাধকতাও তো দেখছি না কোথাও। কেবল নারীরাই নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলে তা তো জানা নেই। গবেট মশাইকে জানিয়ে দিতে চাই যে ভারতে ৩৭৭ ধারা বিলুপ্ত করার পর কেবল হাতে গোনা কয়েকজন সমকামীই উচ্ছসিত হয় নি – হয়েছে ভারতের সকল মানবাধিকার কর্মী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী, অনেক ভারতীয় সাস্থ্য সংস্থা, বলিউডের তারকারা এবং বিশ্বের অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা। যারা সমকামীদের অধিকারে বিশ্বাসী, তারা অনেকেই নিজে সমকামী নন। তিনি এই সহজ ব্যাপারটা হয়তো বুঝবেন না এবং আমার পরিচিত সমকামবান্ধব অনেক বিষমকামী বন্ধু যে আছে সেটা তার উর্বর মস্তিষ্কে হয়তো ঢুকবে না।

মানসিক রোগের ডাক্তার না সেজে আশা করি বলদ মহাশয় তার তথাকথিত জ্ঞান বৃদ্ধি করার চেষ্টা করবেন। আধুনিক যুগে ধর্মীয় কুসংস্কার আর কূয়ার ব্যাঙ-এর রক্ষণশীল চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে আসাটাই ক্রমবর্ধমানভাবে প্রচলিত।

তথাকথিত সমকাম বিশেষজ্ঞের লেখাটির যোগঃ

সমকামিতা একটি মানসিক রোগ




-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি