সমকামিতা বৃত্তান্ত - একটি উত্তর
রিয়াজ ওসমানী

১৫ অক্টোবর ২০১৮



গত ১৬ই সেপ্টেম্বর পরিবর্তন পত্রিকায় খাদিজা আক্তার নামক এক শিক্ষক ও সংস্কৃতি কর্মীর লেখা “সমকামিতা বৃত্তান্ত” নামের একটা প্রচ্ছদ প্রকাশিত হয়। লেখিকার কথাগুলোর উত্তরে কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি এখানে। ভারতবাসীর খুব ছোট একটা অংশ বলতে তিনি কি বুঝাচ্ছেন তা হয়তো তিনি নিজেও জানেন না। সমগ্র প্রথিবীর ৫-১০% মানুষ জন্মগতভাবে সমকামী (তাদের মধ্যে কেউ কেউ উভকামী)। ভারতের জনসংখ্যার ৫-১০% মানুষ কত জন হবেন তার ধারণা তিনি কি রাখেন? আর এটা তো সংখ্যার কোন খেলা না। ৩৭৭ ধারার মত কালো আইনের ফলে এক জন মানুষেরও মৌলিক অধিকার খর্ব হলে সেটাকেও আমলে নিতে হবে।

এখানে পশ্চিমা দেশগুলোকে অনুসরণ করা হয়েছে বইকি। কিন্তু সেটা মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আমদানী করে নয়। বরং যৌন সংখ্যালঘুদেরকে যে এত দিন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হত, তার অবসান ঘটিয়ে ভারত একটা আদর্শ গনতন্ত্রের আরেকটু কাছে পৌঁছে গিয়ে। সেরকম একটা গনতান্ত্রিক দেশে জনসংখ্যার একটা অংশকে নিজের জন্মগত যৌন প্রবৃত্তি এবং/অথবা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। লেখিকা বোধ হয় একটি মানুষের অন্তর্নিহিত যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে কোন ধারণাই রাখেন না। তা না হলে তিনি কিভাবে এত সহজে ভারতের প্রতিবেশী দেশ মানে আমাদের দেশ বাংলাদেশে “পশ্চিমা হাওয়া” বয়ে গিয়ে মানুষের জীবনধারা বদলে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করেন? সমকামিতা কি একটা কর্ম বা জীবনধারা? না! সমকামিতা বাংলাদেশের ৫-১০% মানুষদের জন্য একটা অন্তর্নিহিত যৌন প্রবৃত্তি যা জন্মগত এবং অপরিবর্তনীয়।

বিশ্বের সেরা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো অনেক আগেই গবেষণা করে ঘোষণা দিয়েছে যে সমকামিতা (এবং উভকামিতা) কোন রোগ-বালাইয়ের মধ্যে তো পড়েই না, বরং অল্প কিছু মানুষদের জন্য একটা স্বাভাবিক এবং একমাত্র যৌন প্রবৃত্তি যা অপরিবর্তনীয়। অধিকাংশ পশ্চিমা দেশগুলোর কর্ণধাররা এটা জানার পর (এবং স্থানীয় যৌন সংখ্যালঘুদের দীর্ঘ আন্দোলনের পর) বুঝতে পারে যে ধর্মীয় কুসংস্কার এবং এর সাথেকার সামাজিক ও পারিবারিক রক্ষণশীলতার কারণে তাদের দেশে সমকামবিদ্বেষী বিদ্যমান আইনগুলো ছিল অমানবিক এবং ভুল। আর তাই এগুলো আস্তে আস্তে উঠিয়ে দিয়ে সকল যৌন সংখ্যালঘুদের সর্বাত্মক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে সেই সকল দেশগুলোতে।

বাংলাদেশের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অজ্ঞতার কারণে এটা বলতে ব্যর্থ হয়েছেন যে ১৮৮০’র দশকে বিলেতি উপনিবেশিক শাসকরা “প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌনাচার” কে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের কোথাও কোন সমকাম বিরোধী আইন ছিল না এবং সমাজেও সমকামবিদ্বেষী মনোভাব ব্যাপক ছিল না। বরং যৌনতা, লিঙ্গ এবং লিঙ্গ পরিচয়ের বৈচিত্র্য ছিল বিলেতি শাসক আসার আগেকার সময়ের এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট। ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হবার পর নতুন দেশগুলো ধর্ম এবং এর সাথেকার রক্ষণশীলতার দোহাই দিয়ে এই কালো ধারাটি উঠিয়ে দেয়া কর্তব্য মনে করেনি, যদিও স্বয়ং বিলেতে এই ধারার সমতূল্য অনেক আগেই উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

“সমাজে এ শ্রেণির মানুষ আছে সংখ্যায় খুবই নগন্য যা হয়তো কোনো কোনো দেশে কিংবা সমাজে পার্সেন্টিজেও পড়ে না” – এই কথা বলে লেখিকা কি বুঝাতে চাচ্ছেন? ৫-১০% মানুষ যে যৌন সংখ্যালঘুদের আওতায়ে পড়ে সেই ব্যাপারে তার অজ্ঞতা? না কি তিনি সংখ্যার খেলা খেলতে চাচ্ছেন? আবারও বলছি যে একজন মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হলেও তা আমলে নেয়ার যোগ্য। ইসলাম ধর্মে সমকামিতা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কি না তা নিয়ে পশ্চিমা মুসলমানদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। লুতের ঘটনা সমকামিতার বিরুদ্ধে না কি পুরুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে তা নিয়ে মতের ঐক্য নেই। কিন্ত সব চেয়ে বড় কথা ধর্ম এখানে কি বললো বা না বললো তা নিয়ে বাংলাদেশের মত দেশের মাথা ঘামানোর কোন প্রয়োজন নেই। এর কারণ বাংলাদেশের আইন শরীয়া দ্বারা গঠিত নয় এবং কোন দিন তা হতেও দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের আইন বিলেতিদের রেখে যাওয়া কমন লও (Common Law) দ্বারা গঠিত। আরব দেশগুলোর বর্বর ইসলামী আইনগুলো অনুসরণ করে বাংলাদেশকে মধ্যযুগে নেয়ার চেষ্টা ব্যাহত করা হবে প্রয়োজন হলে আরেকটা স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে।

যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে ডাক্তারই বিজ্ঞান কি বলে সেটাই এখানে মূখ্য। আর সেই ভাষ্যমতে সমকামিতা কিছু মানুষদের একান্তই একটা স্বত্বা, চাহিদা, স্বাভাবিকতা এবং পরিচয়। এবং সেটা হলে সেই মানুষদের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন চলে আসে। চলে আসে তাদের জীবনের সুখ, আনন্দ এবং বিকাশের পথে ব্যাঘাত ঘটানো কালো আইন উঠিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা। চলে আসে বৃহত্তর সমাজে তাদের নিয়ে সচেতনতা, সহিষ্ণুতা, এদের সাথে বন্ধুত্ব এবং সমর্থনের কথা। আর সবচেয়ে বড় যেই জিনিষটার প্রয়োজন, তা হচ্ছে সমকামীদের সাথে পরিচয় এবং তাদের সম্বন্ধে ন্যূনতম জ্ঞান। আর এই খানেই লেখিকা তার ব্যর্থতা প্রকাশ করেছেন। তা না হলে তিনি কি ভাবে বললেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, আলেকজান্ডার দি গ্রেট, রিকি মার্টিন, ওস্কার ওয়াইল্ড, ফ্রান্সিস বেকন, এরিস্টটল, এলেন গিন্সবার্গ – এরা সবাই “সমকামিতায় আসক্ত ছিলেন”? সমকামিতা তো কোন আসক্তি নয়! এটা কি মদ বা মাদক? ইচ্ছা করে কি কেউ সমকামী হতে পারে? জোর করে কাওকে কি সমকামী বানানো যায়? এই তিনটা প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে “একবারেই না”। বিষমকামীকে জোর করে সমকামী বানানো যায় না এবং ঠিক সেই ভাবেই সমকামীকেও জোর করে বিষমকামী বানানো যায় না। এটাই ডাক্তারই বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। তাই বাংলাদেশের ৫-১০% মানুষদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার যে সকল খোঁড়া যুক্তি লেখিকা উপস্থাপন করেছেন তার নিন্দা না জানিয়ে পারছি না। মনের উদারতার অভাব লেখিকার এক মাত্র সমস্যা নয়। যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে চরম অজ্ঞতাও এখানে তার বড় একটা অপূর্ণতা।

পরিবর্তনে ছাপানো লেখাটির যোগঃ

সমকামিতা বৃত্তান্ত




-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি