অশিক্ষিত, গাইয়া, অসামাজিক, নিচু শ্রেনী, বর্বর, মানসিক ভারসাম্যহীন থাকতে চাই
নীলয় নীল

১৪ অক্টোবর ২০১৮

মঞ্চ কাপিয়ে দেই নারীবাদী ভাষণ দিয়ে, কিন্তু ঘরে ফিরেই হয়ে উঠি চরম পুরুষতান্ত্রিক। তবুও তো নারীবাদী। ক্যামেরার সামনে সাত জনের হাত দিয়ে একজন অসহায় মানুষের হাতে খাবার তুলে দিয়ে মানবতাবাদী। ছবির ক্যাপশন দেখে মনে হয় কয়েকটা শেয়াল-কুকুর যেন একজন অসহায় মানুষের হাত থেকে খাবার কেড়ে নিতে চাইছে। তবুও মানবতাবাদী ট্যাগ টা তো আছেই গাঁয়ে চাঁপানো। মঞ্চে সাম্যবাদ আর সমতার অগ্নিঝড়া বক্তব্য চলছে। বক্তব্য শুনে মনে হয় নজরুলকেই যেন শিষ্য বানিয়ে দিয়েছে। মঞ্চ থেকে নামার সময় একজন নীচু শ্রেনীর মানুষের গাঁয়ের সাথে গাঁ লেগেছিল, এর জন্য নাক সিটকিয়ে বিদেশী সাবান মাজা হচ্ছে।

সমকামী, সমকামী অধিকার কর্মী, স্বাধীনতাকামী কতই না লকব। আলোচনায় বসলে দীর্ঘ্য নিঃশ্বাস ফেলে বলতে শোনা যায়, আহা! কবে সমকামীরা স্বাধীন হবে, দূর্দশা ঘুচবে। কিন্তু বাস্তবে সমকামীদের দূর্বলতা কাজে লাগিয়ে বুকে টেনে নিয়ে পিঠে ছুরি মারতে একটুও দ্বিধা হয় না। একবারও ভাবার সময় হয়নি তার অনুভূতিগুলোও তো একই রকম। তারও হৃদয় আছে, সেও কষ্ট পাবে। কি সুন্দর নামের ফ্রেমে বাধিয়ে চলছে অনাচার। এসব শুধু দেখে যাও আর দেখে যাও, কিছু বলতে নেই। বললেই তুমি অশিক্ষিত, গাইয়া, অসামাজিক, নিচু শ্রেনী, বর্বর, লোভী, মানসিক ভারসাম্যহীণ আর কত বাহারের লকব যে জুড়ে যাবে।

এই লকবগুলো আমার ভালই লাগে। ছোট বেলাতেই শিক্ষা ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রাখলেও বাবা মায়ের কষ্ট হবে জেনে নামি-দামী স্কুলে ভর্তি না হয়ে গ্রামের কোন অখ্যাত স্কুলেই থেকে গিয়েছি, সেই স্তরের অশিক্ষিত আমি। এক পাল বন্ধুর পাশ কাটিয়ে একটা অশিক্ষিত, গাইয়া, নাপিত বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে সামাজিকতা নষ্ট করার মত গাইয়া আমি। গ্রামের সবার থেকে একটু আলাদা যে ছেলেটাকে একটু কোমর দুলিয়ে হাটার কারণে চোখের সামনে অনেক যুবক ছেলে পেলে মিলে অপমাণ করছিল, সেটা সহ্য করতে না পেরে সামাজিকতা ভেঙ্গে সবার বিরুদ্ধে গিয়ে যে তুলকালাম ঝগড়া বাধিয়েছিলাম। তাহলে ভাবুন কত নিম্ন স্তরের অসামাজিক আমি।

কোরবানীর ঈদের একদিন আগে বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে রাস্তার ধারে এক অতিশয় বৃদ্ধা মহিলাকে রাস্তার ধারে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে কিছু দূরে পার হয়ে এসে আবার ফিরে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে "মনে হয় পেটের ক্ষুধায় কাঁদছে, পকেটে তো দশটা টাকা আছে, সেটাই দিয়ে আসি, যা হয় একটু খেয়ে নেক"। কিন্তু ফিরে গিয়ে দেখি সে ভিক্ষা করছে না - অন্ধ বেচারি সকালে পথ ভুলে কাঠফাটা রোদে একই রাস্তায় বার বার ঘুরতে ঘুরতে পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েছে। ফেলে রেখে আসতে পারিনি সেও আমার মতই হয়তো নিচু শ্রেনীর বলে। কিছুটা জল আর রুটি খাওয়ায়ে দুই ঘন্টা ধরে খোঁজাখুঁজি করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলাম। তাহলে ভাবনু কতটা নিচু শ্রেনীর আমি - হয়তো নিচু শ্রেনীর না হলে এদের প্রতি কোন টানই খুঁজে পেতাম না।

রক্তচোষা মানুষের মতই দেখতে এক দোপেয় হিংস্র জানোয়ার কিছু অসহায় সমকামী ভাইয়ের রক্ত চুষে খাচ্ছিল। খবর পেয়ে বসে থাকতে না পেরে দুই মাস নাওয়া খাওয়া আর ঘুম ত্যাগ করে সেই জানোয়ারকে ধরার ফাঁদ পেঁতেছিলাম আর শেষে বাধ্য করেছিলাম সেই জানোয়ারের বাপকে পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে। এটাতেই বুঝুন আমি কতটা বর্বর। একটা ভালবাসা, প্রণয়ের সম্পর্ককে রক্ষা করার সব রকম চেষ্টা করেছি, একতরফা ভাবেই ছাড় দিয়েছি, শেষে পা ধরে বলেছিলাম সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য। ফেরাতে না পেরে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি, কত প্রহর অপেক্ষা করেছি - আমি এরকমই অতি লোভী।

নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে লাথিগুঁতো তো আর কম খেলাম না। মানসিক ভারসাম্যহীণ না হলে কে বা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যায়! তবুও আমি অশিক্ষিত, গাইয়া, অসামাজিক, নিচু শ্রেনীর, বর্বর, লোভী, মানসিক ভারসাম্যহীনই থাকতে চাই। কারণ আমার অস্তিত্বই এসবে মিশে গেছে। কাগুজে কিছু আইনকে পরিবর্তনের জন্য আমাদের কতই না প্রস্তুতি আর কতই না সাজসজ্জা। কিন্তু আমরা ভুলেই গেছি ওসব কাগুজে আইন আমরাই তৈরি করেছি। আমাদের পরিবর্তন হলে ওসব কাগুজে আইনও পরিবর্তন হতে বাধ্য। আমরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করি নি। ব্যর্থ হয়েছি আমরা - মরে গেছে আমাদের বিবেক। মৃত বিবেক নিয়ে কাঠের পুতুল হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি