সমপ্রেমী মা রোহিত
অ্যালেক্স শান্ত বৈরাগী



রোহিত একজন গ্রাম্য স্কুল মাষ্টারের ছেলে, তারা মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে একটা পরিবার। রোহিত তার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে তাই সে পরিবারের কাছে খুব আদরের, গরীব হলেও তার বাবা মা তাকে রাজকীয় ভাবেই বড় করার চেষ্টা করছে সবসময়। রোহিত খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে ছবি আঁকতে ভালোবাসে, রোহিত একটা ঠান্ডা মেজাজের খুব শান্ত শিষ্ট ছেলে যার গায়ের রং ফর্সা এবং চেহারাটা খুব মায়াবী। রোহিত ভালোবাসে তাদের গ্রামকে গ্রামের সব নিরব পরিবেশকে, গ্রামের প্রতিটি মানুষকে। গ্রামের ছোট বড়, ধনী গরীব, কৃষক, মাঝি জেলেরা সকলেই রোহিত কে ভালোবাসে, সকলে সবসময়ই বলে রোহিতের মত ভালো ছেলে আর হয় না।

তার গ্রামে উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি নদী কির্তিনাশা। রোহিত সেই নদীকে খুব পছন্দ করে – বর্ষার সময় যখন নদীতে জল থৈ থৈ করে, তখন রোহিত জেলে ও মাঝিদের সাথে নৌকায় চরে ঘুরে বেড়ায়, জেলেরা মাছ ধরে আর রোহিত সেসব দেখে নৌকায় বসে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য গুলো ছবি আঁকে। নদীতে রাজহাঁস, পাতিহাঁস ভেসে বেড়ায়, শাপলা ও পদ্মফুল ফুটে থাকে জলের উপর, রোহিত নৌকায় বসে বসে ঐসব দৃশ্যরও ছবি আঁকে। এছাড়াও তার গ্রামের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি তাকে সবসময় মুগ্ধ করে, রোহিত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও গ্রাম্য পরিবেশ নিয়েই সবসময় চিত্র আঁকে। প্রকৃতি যেন তার এতটাই আপন – সে যেন প্রকৃতির সাথে নিজেকে বিলীন করে দেয়। সে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে তার আরাধ্য দেবীর মা কালীর পূজোর ফুল সংরক্ষনের জন্য গ্রামের বনে বনে ঘুরে বেড়ায়, ফুলের উপর একটি প্রজাপতি বা একটি মৌমাছি দেখলেই সে ঐ ফুলটি আর ছিড়ে না। তবে ঐ ফুলের মৌমাছি ও প্রজাপতির দৃশ্যটি গেথে রাখে তার অন্তরে, যাতে পরবর্তিতে সে এই দৃশ্যটি আকঁতে পারে। এ ছাড়াও বনের প্রতিটি গাছ ও প্রতিটি পাখি তার খুব পরিচিত – তাকে দেখলেই যেন বনের পাখিরাও খুশিতে চেচিয়ে ওঠে – বিশেষ করে শালিক পাখিগুলো, কারন রোহিত মাঝে মাঝেই শালিক পাখিকে খাবার খাওয়াতো। তাই শালিক পাখিগুলো তাকে দেখলেই উড়ে এসে তার মাথায়, কাধে ও হাতে চড়ে বসে – সে শালিকগুলোকে নিজের হাতে বসিয়ে খাবার খাওয়াতো এবং একটি একটি করে সবগুলো পাখিকে হাতে নিয়ে চুমো খেতো, আর শালিক গুলোও নিরব নিথর হয়ে থাকতো যেমন কোন মা তার সন্তানদের ভালোবাসার মমতায় সিক্ত হয়ে আদর করছে!!!!

গ্রামে যখন ইড়ি ধানের মৌসমে কৃষকরা জমিতে ধান রোপন করে তখন, রোহিত দূরে দারিয়ে থেকে দেখে কিভাবে কৃষকরা ধান রোপন করছে, এবং বাড়ি ফিরে সে কৃষক এবং ধান রোপনের চিত্র আকেঁ। যখন ইড়ি ধানের মৌসম শেষ হয়ে যায়, আর কৃষকরা ধান কেটে ধান মাথায় করে গ্রামের পথ ধরে সাড়ি বেধে হেটে যায়, সেই দৃশ্যটি দেখে তার হৃদয় ছুয়ে যায় এবং রোহিত গুনগুন করে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে থাকে – “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস, ও মা আমার প্রানে বাজায় বাঁশি।। ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রানে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে”। রোহিত যেমন ভালো ছবি আঁকে তেমনি খুব ভালো গান করে। খুব মিষ্টি কন্ঠ তার – এছাড়াও নৃত্য ও অভিনয়ের প্রতিও সে খুব বেশি আগ্রহী। আর এজন্য গ্রামের যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মিয় উৎসবে তাকে ডাকা হয়। মাঘ মাসে স্বরসতী পূজোর সময় ৫দিন ব্যাপী গ্রামে ধর্মীয় যাত্রাপালা হয়, সেই যাত্রায়ও অভিনয় করে রোহিত। রোহিত সব সময় নারী চরিত্রে অভিনয় করতে পছন্দ করে, রাম সীতা যাত্রায় রোহিত সবসময় সীতা হয়ে অভিনয় করতেন, বেহুলা লক্ষীন্দর পালায় সে দেবী মনসা হয়ে অভিনয় করে।

রোহিত ছবি আঁকা, গান, অভিনয় এত কিছুর মধ্যে থেকেও তার মনে এক অজানা চাপা কষ্ট নিয়ে বয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার কষ্ট গুলো কাউকে বলতে পারে না। কারন রোহিত যখন বুজতে শিখেছে তার নিজের অস্তিত্ত্বকে, তখন থেকেই সে অনুভব করতে শুরু করেছে যে সে একজন সমপ্রমী – সেই ছোট বেলা থেকেই সে নিজেকে একজন মেয়ের মত করে দেখে, তার মনে অনেক স্বপ্ন যদি অন্য সব মেয়েদের মত তার যদি স্বামী থাকতো? সেও যদি সন্তানের মা হতে পারতো। এই সব কল্পনা জল্পনা নিয়েই তার সারাবেলা কেটে যায়। তার খুব শখ মেয়েদের মত করে সাজতে, তাই মাঝে মাঝেই তার মায়ের শাড়ী পরে মেয়ে সাজতো, আর তার মধ্যে কিছুটা মেয়েলি ভাব থাকায় গ্রামের কিছু বখাটে ছেলেরা হাফ লেডিস বলে তাকে টিটকারী করতো, কিন্তু রোহিত কখনোই তাদের সাথে রাগ করতো না হেসে উড়িয়ে দিত।

রোহিত মা কালীর খুব ভক্ত। তাদের গ্রামে জাগ্রত একটা কালী মন্দির আছে, রোহিত প্রতিদিন সকালেই ঘুম থেকে উঠেই স্নান করে রক্তজবা ফুল সংরক্ষন করে মন্দিরের পুরোহিত কে দেয়, পুরহিত যতক্ষন পূজো করে, ততক্ষণ রোহিত মন্দিরে পুরহিতের পাশে বসে থাকে,পুরোহিত রোহিত কে খুব আদর করে, পুরোহিতের ছেলে সজল-ই হলো রোহিতের একমাত্র বন্ধু, এছাড়া গ্রামে তার কোন বন্ধু নেই বললেই চলে!! কারন সে সবসময় একা থাকতে পছন্দ করে। তার মনটা যখন ভীষন খারাপ থাকে তখন সে নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকে নয়তো সেই কালী মন্দিরে গিয়ে পড়ে থাকে।

একদিন প্রান্ত বিকেলে সে নদীর পাশে বসে আছে – সূর্যটা লাল হয়ে অস্ত যাচ্ছে, সে তাকিয়ে আছে নদীর জলের দিকে, নদীজলে তার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে, সে নিরবে একা একা বসে বসে তার জীবন নিয়ে ভাবছে!! কেন বিধাতা আমাকে একটা নারীর মত মন দিলো? আমার উপরটা পুরুষ কিন্তু ভিতরে এক নারী সত্ত্বা। সে হাউমাউ করে কেদে উঠলো, হে মা কালী? কেন মা আমি মেয়ে হয়ে জন্ম নিলাম না? তাহলে আমার স্বামী হতো, সন্তান হতো, একটা সংসার হতো, তার চোখের জল নদীর জলের মধ্যে পড়ছে আর টপ টপ করে শব্দ হচ্ছে। তার কান্নায় তার আত্ননাতে যেন, জলের দেবী মা গঙ্গা ও কাঁদছে। রোহিত দু’হাত বারিয়ে বলছে হে বিধাতা এ তোমার কি লীলা? উপরে পুরুষ ভিতরে নারী – আমি এক সমপ্রেমী। এমনি করেই তার গ্রামের পরিবেশে জন্ম থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত বড় হয়, কিন্তু রোহিত এখন গ্রামের স্কুল থেকে ফার্ষ্ট ক্লাসে মাধ্যমিক পাশ করেছে। রোহিতের বাবার স্বপ্ন রোহিতকে শহর থেকে লেখাপড়া করাবে, তার বাবার স্বপ্ন পুরন করতে রোহিতকে বাধ্য হয়ে তার প্রিয় গ্রাম, প্রিয় জন্ম ভূমি ছেড়ে শহরে চলে যেতে হবে।

রোহিতের শহরে যাওয়ার দিন চলে এসেছে – সে তার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে, তাকে বিদায় জানাতে এসেছে গ্রামের ছোট বড় অনেকেই। সবার চোখেই জল টল টল করছে। রোহিত খুব কাঁদছে তার দু নয়নের অশ্রু যেন ঝর্না ধারায় ঝরছে। রোহিতের মা বাবাও খুব কান্না করছে। বিদায়ের বেলা – গ্রামের লোকজন বলতেছেঃ “রোহিত তুমি তো খুব সুন্দর গান করো কি মিষ্টি কন্ঠ তোমার? যাবার বেলায় আমাদের কে একটা গান শুনিয়ে যাও”। রোহিত গ্রামবাসীর অনুরোধে একটি গান গাইতে শুরু করলো। “গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে।। ওরে কার পানে মন হাত বাড়িয়ে লুটিয়ে যায় ধুলায় রে।। ওযে আমায় ঘরের বাহির করে পায়ে -পায়ে পায়ে ধরে।। (মরি হায় হায় রে)”। রোহিত গ্রাম থেকে শহরে চলে আসছে, কিন্তু রোহিত গ্রামের সহজ সরল একটি ছেলে, শহরের হাফ-ভাব সে কিছুই বোঝে না। শহরের পরিবেশ যেন অন্য রকম – যানজট, মানুষ জনের কোলাহল তার ভালোলাগে না। গাড়িতে উঠতে গেলে মানুষের ভিড় আবার রাস্তাঘাটে হাটা চলা করাও বড় মুশকিল। সবজায়গায় শুধু মানুষের ভিড় – রাস্তার পাশেই ময়লার ডাস্টবিন বাতাসে যেন গন্ধ ছড়ায়, সবমিলিয়ে শহরে গিয়ে রোহিত নিজেকে বড় অসহায় অনুভব করে – খুব মনে পড়ে তার গ্রামের কথা তার বাবা মায়ের কথা আর নিরবে একা একা কাঁদে।

তবুও তার বাবার স্বপ্ন তাকে পুর্ন করতেই হবে, তাই সে শহরের পরিবেশের সাথে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। সে প্রথম যেদিন কলেজে যায় সেদিন তার ক্লাসমেটরা তো ওকে নিয়ে হাসাহাসি টিটকারী শুরু করলো, একজন বলেই বসলো গাইয়া ভূত কোথা থেকে এসেছে – আনস্মার্ট বলে বকা দিয়েই বসলো। রোহিত তাদের কথাগুলো নিরবে শ্রবন করলো, কোন প্রতিবাদ জানালো না। রোহিত খুব ভালো ছাত্র তাই তার কলেজের শিক্ষকরা তাকে খুব আদর করে, রোহিত ছোট থেকেই একাকি থাকতে পছন্দ করে – বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা করা তার ভালো লাগে না। তার বাসার কাছাকাছি একটি কালি মন্দির আছে, অবসর সময়ে সে ঐ মন্দিরে বসে একাকি সময় কাটায় এবং তার স্বপ্ন নিয়ে কল্পনা করতে থাকে।এবং প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা সে মন্দিরে গিয়ে মা কালীর পূজোর প্রসাদ গ্রহন করে।

একদিন সন্ধ্যা বেলা মন্দিরে অনেকে বন্দনা গীত গাইছে। তখন রোহিতও একটি শ্যামা সঙ্গীত (মা কালীর গান) গাইতে শুরু করলো। “সকলই তোমারই ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি মা তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি”। তার গান শুনে সবাই মুগ্ধ – ঐ মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গেও তার ভাব জমে উঠেছে। রোহিত শহরে আসছে বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে, আর সে নিজেকে শহরের সাথে মিলিয়েও নিয়েছে – অনেকটা স্মার্ট ও হয়ে গেছে রোহিত। একদিন সকালে পত্রিকা খুলে দেখতে পায় সমপ্রেমীরা রংধনু মিছিল করেছে, সে কোন একসময় ভাবতো সে বুঝি একাই এমন চিন্তাধারার একজন মানুষ, কিন্তু শহরে আসার পর সমপ্রেম সম্পর্কে তার অনেক ধারনা হয়, সে স্বপ্ন দেখে তার যদি একজন স্বামী থাকতো, সে যদি বাচ্চার মা হতে পারতো? কিন্তু রোহিত এখন বড় হয়েছে বাস্তবতা বুঝতে শিখেছে, সে এখন মনে মনে ভাবে যা কখনো সম্ভব না এসব স্বপ্ন আমি কেন দেখি!!!! এসব ভাবতেই সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সে এখন বাস্তবতা বুজতে শিখেছে, তবুও তার মনের আকাঙ্খাগুলোকে কিছুতেই দুর করতে পারছে না – তার লেখাপড়ায় ও তার মন বসে না। সারাক্ষন উদাসিন হয়ে থাকে।

একদিন বিকেলে সে কালি মন্দিরে যায় এবং জোরে জোরে মন্দিরের ঘন্টা বাজায়, এবং মা কালীর কাছে হাত জোর করে কান্নায় ভেঙ্গেপরে রোহিত!!!! মা মাগো যে স্বপ্ন কোনদিনও পূরন হওয়ার নয়, সে স্বপ্ন মনে কেন দিলা? কেন মা কেন!!! আমি সমপ্রেমী হইলাম কেন!!!!! রোহিত চোখের জল মুছে, বাসায় চলে যায় সেদিন। রাতে কিছুতেই তার চোখে ঘুম আসছিলো না!! রোহিত দুইটি ঘুমের বড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। রাত যত গভির হলো সেও গভীর ঘুমে নিমগ্ন হলো। আর ঠিক তখনি তার আরাধ্য দেবী মা কালি তাকে স্বপ্নে দর্শন দিলেন। দেবী তাকে ডাক দিলেন। রোহিত তাকিয়ে দেখো বাবা আমি এসেছি, রোহিত স্বপ্নের মাঝেই দেবীকে হাত জোর করে প্রনাম করলেন। “মা মাগো মা কালি তুমি আমার ডাকে সাড়া দিয়েছো মা??” দেবী কালী বললেন তোর মনের বাসনা আমি পূর্ন করবো। এই বলে দেবী অদৃশ্য হয়ে গেল।

পরের দিন সকালে রোহিতের ঘুম ভাঙ্গারর পর রোহিত তার রাতের স্বপ্নের কথা ভাবলো, এবং রোহিত স্নান করেই সেই মন্দিরে গেলো এবং দেবীকে প্রনাম করেই মন্দিরের পাশে একটা নিরব জায়গায় একা বসে রইলো। তার কিছুক্ষন পর সে দেখলো হঠাৎ একজন যুবক এসে মন্দিরে বসে খুব জোরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে। ঐ লোকটির কান্না দেখে রোহিতের চোখ দিয়েও জল পড়ছে। রোহিত অনেক আবেগী একজন মানুষ – রোহিত লোকটির পাশে গিয়ে বসলো এবং তার মাথায় হাত রাখলো। লোকটি রোহিতের দিকে তাকালো – লোকটি দেখতে পেলো রোহিতের চোখেও জল। লোকটি নিজের চোখের জল মুছে রোহিত কে জিজ্ঞেষ করলোঃ “কে তুমি ভাই”? রোহিত লোকটির পাশে বসলো এবং বললোঃ “আমার নাম রোহিত”। লোকটি বললো যে তার নাম শয়ন। রোহিত শয়নকে বললোঃ “আচ্ছা দাদা যদি রাগ না করেন তাহলে একটা প্রশ্ন করতে পারি”? শয়ন বললোঃ “হ্যা বল”। রোহিত বললোঃ “আপনার কিসের এত কষ্ট”? পরে লোকটি বললোঃ “ভাই আমি অনেক বড় একটা বিপদে আছি – আমি প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম। আমার স্ত্রীর ও আমার পরিবারের কেউ আমাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। বিয়ের পর একটি মেয়ে হয়, আর মেয়ে জন্মদেয়ার সময় আমার স্ত্রী মারা যান। আজ ৪ মাস হলো তার দিদা ও ঠাকুর মা কেউ তার দায়িত্ব নিতে চায় না, আমিও চাই না। দ্বিতীয় বিয়ে করে সৎ মায়ের অনাদরে আমার মেয়ে বড় হোক, এসব মিলিয়ে বড় অসহায়। আমি জানিনা কি করবো আমি, ছোট একটা চাকরি করি – এদিকে নিজের সন্তান সামলাবো, না নিজের চাকরি করবো”। লোকটির কথা শুনে রোহিতের মনে নতুন করে আশার আলো প্রজ্বলিত হলো – রোহিত লোকটির ফোন নাম্বার রেখে দিলো। রোহিত বাসায় ফিরে বার বার ঐ বাচ্চাটির কথা ভাবতে লাগলো আর কল্পনা করতে লাগলো। মায়ের মমতায় লালন করছে, নানান কল্পনা করছে বাচ্চাটিকে নিয়ে। রোহিত রাতে শুয়ে শুয়ে এপাস ওপাস করছে, কেমন যেন ছট-ফট করছে, কিছুতেই ঘুম আসছিলো না রোহিতের। সব শেষে রোহিত রাতে শয়ন কে ফোন দিলো। শয়নের কাছে রোহিত নিজের মা হওয়ার স্বপ্ন গুলোর কথা খুলে বললো, এবং রোহিত শয়ন কে বললো দাদা আমি আপনার মেয়ের দায়িত্ব নিতে চাই, বিনিময়ে আমি কিছুই চাইবো না আপনার কাছে, কিন্তু শয়ন বললোঃ “তুমি তো ছেলে”!!

“কি করে একটা বাচ্চার দায়িত্ব নিবে বলো? এটা হয় না রোহিত”! রোহিত বললোঃ “প্লিজ দাদা আমাকে একটা সুযোগ দিন”। রোহিতের অনুরোধে শয়ন রোহিত কে শান্তনা দেয়ার জন্য বললো আচ্ছা ভাই তুমি প্রতিদিন আমার বাসায় এসো আর আমার মেয়েকে দেখে যেও, আদর করে যেও। রোহিত পরের দিন শয়নের বাসায় গেল আর ঐ শিশুটিকে কোলে নিয়ে জরিয়ে ধরে মায়ের মত স্নেহ করে আদর করলেন। রোহিত এখন প্রতিদিন শয়নের বাসায় যায় এবং বাচ্চাটি কে লালন পালন করতে লাগলো। নিজের হাতে গোসল করায়, নিজের হাতে বাচ্চাটিকে খাওয়ায়, নিজের বুকে রেখে ঘুম পারায়, রোহিতের স্নেহ ভালোবাসা দেখে শয়ন দিন দিন মুগ্ধ হচ্ছে। একদিন সকালে রোহিত শয়নের বাসায় গেল – গিয়ে দেখে বাচ্চাটি খুব কান্না করছে। শয়ন বাচ্চাটি কে কিছুতেই থামাতে পারছিলো না। রোহিত শয়নের থেকে বাচ্চাটি কে নিজের কোলে নেয় আর একটু চুমু খায়। বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে রোহিত হেটে হেটে ঘুম পাড়ানী গান গাইতে শুরু করলো। “ঘুম পাড়ানী ঘুমের পরী আয়রে আয়, আয়রে আয়, সোনামনির দুটি চোখে ঘুমের পরশ দিয়ে যা”। গান গাইতে গাইতেই বাচ্চাটি কান্না থামিয়ে, আস্তে আস্তে রোহিতের কোলে ঘুমিয়ে পরলো। এই দৃশ্য দেখে শয়ন অবাক হয়ে গেলো। শয়ন কাঁদো কাঁদো কন্ঠে রোহিত কে বললোঃ “রোহিত, সত্যিই আজ নিজেকে খুব হালকা লাগছে। তুমিই পারবে আমার মেয়েকে লালন পালন করতে। প্লিজ রোহিত তুমি আজ তোমার জামা কাপড় সব কিছু নিয়ে আমার বাসায় চলে এসো – ও এখন থেকে তোমার আর আমার দুজনেরই মেয়ে”।

শয়নের কথা শুনে রোহিত তো আনন্দে আত্মহারা। রোহিত স্থায়ী ভাবে শয়নের বাসায় চলে এলো এবং বাচ্চাটিকে খুব যত্নে মায়ের মমতায় দেখাশোনা করতে লাগলো। একসময় রোহিত ভাবলো সেও তো একজন ছেলে – তারো তো কিছু একটা কাজ করা উচিত!! কিন্তু কি কাজ করবে? চাকরি করতে হলে তো তাকে দীর্ঘ সময় অফিসে থাকতে হবে? তখন বাচ্চাটি কে দেখবে? সব শেষে সে সিদ্ধান্ত নিলো বাসায় বসে সে টিওশনি করবে। এই কথা সে শয়ন কে জানালো – শয়ন ও সম্মতি দিলো। সে বাসায় বসে কয়েকটা ব্যাচ পড়ায় এবং বাচ্চাটিকেও দেখা শোনা করে। বাচ্চাটির ৬ মাস পুর্ন হয়েছে। একদিন বিকালে বাচ্চাটিকে নিয়ে শয়ন ও রোহিত দুজনেই বেলকোনিতে বসেছিলো আর দুজনে গল্প করছিলো, এরই মাঝে হঠাৎ বাচ্চাটির মুখে একটা কথা ফুটলো। বাচ্চাটি রোহিতের দিকেই তাকিয়ে ছিলো এবং মা বলে উঠলো। শয়ন আর রোহিত দুজনেই অবাক হয়ে কতক্ষন নিস্তব্ধ হয়ে রইলো – যেন নিস্তব্ধতার দেবী তাদের উপর ভর করেছে। কিছুক্ষন পর দুজনেই হা হা হা করে হেসে উঠলো”’ রোহিত আজ প্রথমবার মা ডাক শুনলো – তার মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। এভাবেই কয়েকটি মাস কেটে গেল, শয়ন একজন বিষমকামী ছেলে তবুও সে দিন দিন কেমন যেন রোহিতের প্রতি দূর্বল হতে লাগলো। শয়ন মনে মনে রোহিত কে ভালোবাসতে শুরু করলো।একদিন শয়নের অফিস বন্ধছিলো তারা দুজনেই বাসায় ছিলো। রোহিত রান্না করছিলো আর শয়ন বাচ্চাটিকে কোলে করে বসে ছিলো। হঠাৎ বাহিরে খুব জোরে বৃষ্টি নামতে শুরু করলো। বৃষ্টি দেখে রোহিত আর নিজেকে সামলাতে পারলো না কারন তার বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগে। তাই সে দৌড়ে বাহিরে চলে গেলো। বাসার পিছনে খোলা একটা মাঠ আছে সেখানে দুর্বা ঘাসে শুয়ে পড়লো। রোহিত বৃষ্টিতে ভিজছে আর শয়ন বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে জালানা দিয়ে রোহিতের কান্ড দেখছে আর একা একা হাসছে। কিছুক্ষন পর রোহিত মাঠের মধ্যে দাড়িয়ে পড়লো – বৃষ্টির পানি হাতে জমা করে একটি গান গাইতে লাগলো। “আঝি ঝড়ো ঝড়ো মুখরো বাদল দিনে জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না,ঝড়ো ঝড়ো মুখরো বাদল দিনে।। এই চঞ্চল সজল পবন বেগে উদ ভ্রান্ত মেঘে, মন চায় মন চায়”।

রোহিতের গান শুনে শয়ন তো হতভাগ!! শয়ন মনে মনে ভাবছে রোহিতের কন্ঠ এত মিষ্টি এত সুন্দর গান করে রোহিত? রোহিত যখন বৃষ্টিতে ভিজছে তখন সে খালি গায়ে ছিলো তার শরীরের হালকা পশম গুলো যেন চক চক করছে , আর একটা ট্রাউজার পরা ছিল। আজ এই অবস্থায় দেখে শয়নের মনে আজ প্রথমবার রোহিতের প্রতি তার কাম ভাব অনুভব হলো। রোহিত আর শয়নের মেয়ের আজ ১বছর পূর্ণ হয়েছে। তাদের মেয়ে শতরূপাকে নিয়ে তারা দুজন সন্ধ্যা বেলা কালী মন্দিরে যায় পূজো দিতে। শয়ন তার মেয়েকে নিয়ে মন্দিরের বাহিরে দাড়িয়ে থাকে আর রোহিত মন্দিরের ভিতর যায় পূজো দিতে। রোহিত মন্দিরে মা কালীর সামনে দু’হাত জোর করে তাদের মেয়ে শতরূপার জন্য প্রর্থনা করে আর একটি গান গাইতে শুরু করে। “তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিনো মর্ম মুছায়ে।। তব পূর্নকিরন দিয়ে, যাক মোর মোহ কালিমা গুছায়ে ,মলিন মর্ম মুছায়ে।। লক্ষ, শুন্য লক্ষ বাসনা, ছুটিছে গভির আধারে, জানিনা কখন ডুবে যাবে কোন, অকুলো গরোল পাথারে।। প্রভু বিশ্ব বিপদ হন্তা, তুমি দারাও রুদিয়া পন্থা। তব শ্রী চরন তলে, নিয়ে এসো মোর, মর্ত্য বাসনা গুছায়ে, মলিন মর্ম মুছায়ে”।

শয়ন বাহিরে দাড়িয়ে রোহিতের গান শুনছিলো,আর মনে মনে বলছে হে মালী আজ আমি রোহিত কে আমার মনের কথা বলতে চাই? তুমি আমায় সাহস দাও মা। মন্দির থেকে তারা দুজন বাসায় ফিরে যায়, রাতে শয়ন বলে রোহিত আজ তোমাকে কিছু বলতে চাই, রোহিত বললো আচ্ছা বলুন কি?? শয়ন রোহিত কে তার বুকে টেনে নেয়, I love you, really love you. রোহিত একটা দীর্ঘ স্বাস ফেলে বলে, আমি তোমাকে প্রথম দেখাতেই ভালেবেসে ফেলেছি। I love too. একদিন সন্ধ্যার পর রোহিত বাচ্চাটিকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বই পড়ছিল। হঠাৎ রোহিতের মেয়ে সাজতে খুব ইচ্ছে করলো। সে আলমারী খুলে শয়নের মৃত স্ত্রীর কিছু সিটিগোল্ডের গহনা, ও শাড়ী দেখতে পেলো। রোহিত একটা শাড়ী বের করে পরলো, আর গহনা গুলোও পরেছিল। মেয়ে সেজে রোহিত আয়নার সামনে দাড়ালো, আর এরই মাঝে অফিস থেকে বাসায় ফিরলো শয়ন। শয়ন বাসায় ডুকতেই এই অবস্থায় দেখে ফেললো রোহিতকে।

রোহিত লজ্জা পেয়ে শাড়ীর আচোল দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে দিলো আর শয়ন রোহিত কে এই অবস্থায় দেখে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে যায় শয়ন রোহিতের মুখ থেকে আচোল সরিয়ে হালকা করে লিপ কিস করলো। রোহিতের কাছে মনে হলো সারা পৃথিবীর সুখ যেন তার মধ্যে জড়ো হয়েছে। রোহিতও শয়ন কে একটা কিস দিলো, শয়ন রোহিতকে কোলে কোরে খাটে নিয়ে শুয়ে দিলো, এবং তার কোমল মুখে কিস করতে শুরু করলো শয়ন। শয়ন রোহিতের শরীর থেকে কাপর খুলতে শুরু করলো। রোহিত বললে উহু না, আগে আমাকে মাকালী কে শাক্ষী রেখে সিদ সিদুর পরিয়ে দাও – বিয়ে করো আমাকে তারপর সব হবে। পরের দিন রোহিত শাড়ী গহনা পরে বউ সাজলো, আর শয়ন রোহিতের কথা মতো রোহিত কে সিঁদুর পরিয়ে দিল এবং মালা বদল করে বিয়ে করলো। সব শেষে ফুলসজ্যা ও হলো। রোহিতের মনের বাসনা পূর্ন করলেন তার আরাধ্য দেবী মা কালি। রোহিত স্বামী ও সন্তান দুটাই পেলো আর শয়ন পেল তার সন্তানের জন্য যোগ্য মা যে নিজের জীবনের থেকে, তার মেয়ে কে ভালোবাসে।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি