৩৭৭ ধারা নিয়ে রায়ঃ ভারতে যেভাবে রংধনুর সংগ্রামের জয় হল
আদিত্য বন্দোপাধ্যায়

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮



প্রায় ২০ বছর আগে ১৯৯৮ সালের হেমন্তে আমার তখনকার কর্ণধার (বর্তমানে একজন জ্যেষ্ঠ উকিল) মিঃ আনান্দ গ্রোভার আমাকে ভারতের দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারার সাংবিধানিকতাকে সংপ্রশ্ন করার জন্য একটি আবেদনপত্র তৈরি করতে বলেন। এই ধারাকে সাংবিধানিক ভিত্তিতে নাকচ করার জন্য কিভাবে এগুতে হবে তা নিয়ে অনেক অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও বিতর্ক হল। আমরা এখানে এমন একটা সময়ের কথা বলছি যখন “আমরা এই দেশের নাগরিক – আমাদেরকে আমাদের মত করে যৌন মিলন করার অধিকার দাও” এটা বলে আদালতে সরাসরি যাওয়ার কোন উপায় ছিল না।

এই কারণে আমি দরখাস্তের যেই খসড়াটা তৈরি করি তা স্বাস্থ্যের অধিকারের ভাষায়ে ব্যক্ত করা ছিল। আমরা বলেছিলাম যে ৩৭৭ ধারার কারণে যে সকল পুরুষ অন্যান্য পুরুষদের সাথে যৌন মিলন করে, তাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোন হস্তক্ষেপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে যার ফলে তাদের মাঝে এইচআইভির যেই ব্যাপকতা বিরাজমান, তা নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। আমরা তর্ক করি যে এই পরিস্থিতিটা তাদের জীবনের সাম্যতার খেলাপ সৃষ্টিকারী এবং ৩৭৭ ধারাকে তাই বিলুপ্ত করতে হবে। আমরা বস্তুতভাবে শিকল বাঁধা হাতেই সংগ্রামের মাঠে নেমে পড়ছিলাম।

কিন্তু এই আবেদনটা করতে গিয়ে আমরা কিছু অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখতে পাই। ৩৭৭ ধারার সাংবিধানিকতা যাচাই করতে গিয়ে গোটা সমাজে বিতর্ক শুরু হল আর দেশ জুড়ে যৌন সংখ্যালঘুদের মাঝে সভাসমিতি ঘটতে লাগলো দিল্লি উচ্চ আদালতে সম্ভাব্য মামলাটার জন্য কিভাবে অগ্রসর হওয়া যায় তা নিয়ে। এদিকে মুখ্যমন্ত্রী রাজনাথ সিংহর অধীনে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক সরকরারের আমলে “ভরসা” এবং “নাজ ইন্টারন্যাশনাল” এর উপর “লক্ষ্ণৌ রেইড” নামে একটা হামলা করা হয় যেখানে পুরুষদের সাথে যৌন মিলন করে এমন অন্যান্য পুরুষদের মাঝে এইচআইভি ছড়ানোর ক্রিয়া বন্ধ করার জন্য কিছু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। ভারত সরকারের নিয়মাবলির আওতায়েই যারা কাজ করছিল তাদের বিরুদ্ধে এরকম একটা সমকামবিদ্বেষী কান্ড যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে এক রকম ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং তাদেরকে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে বাধ্য করে।

দিল্লির উচ্চ আলাদতে এই মামলাটি সহজভাবে উত্তীর্ণ হয় নি। অনেক চড়াই উতড়াই পার হতে হয় যার মধ্যে একটি ছিল আলাদত সেই মামলা খারিজ করে দেয়ার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে হাজির হয়ে দিল্লিতে সেই মামলা পুনরায় স্থাপন করা। একই সময়ে আমাদের গোষ্ঠীটা এই মামলাটি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল এবং যারা এটার সাথে জড়িত তাদেরকে সমর্থন দেয়ার জন্য শক্তি যোগাচ্ছিল। প্রতিটা ওঠা নামার সময়ে আমাদের সম্প্রদায়টা আরও একত্রিত হতে শুরু করে এবং তখনকার সকল মন্ত্রণামূলক কর্মকান্ড এবং সবার মাঝে একটা সংহতিপূর্ণ ভাব আমার মতে তখন ভারতে যৌন সংখ্যালঘুদের আন্দোলনের সূচনা তৈরি করে দেয়। পুরা সম্প্রদায়টিই তখন একটা সর্বজনীন প্রতিপক্ষের দিকে নজর দিতে সক্ষম হয় এবং সেটার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে আরম্ভ করতে পারে।

এই ক্ষমতায়নটির ফলে বিভিন্ন দল একত্রিত হয়ে “৩৭৭ এর বিরুদ্ধে কন্ঠ” তৈরি করে যেটা দিল্লি উচ্চ আদালতে এই ধারার ফলশ্রুতিতে সমকামীদের খর্বিত নাগরিক অধিকার চেয়ে একটি নতুন আবেদনের সহায়ক হয়। অবশেষে ২০০৯ সালের দোসরা (২) জুলাই তারিখে বিচারক শাহ আর মুরালিধরের মুখে দিল্লি আদালত থেকে সেই মামলাটির একটি রায় আসে। রায়ে ভারতের দন্ডবিধির ৩৭৭কে দেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করা হয় এবং নৈতিকতার প্রশ্নে সরাসরি বলে দেয়া হয় যে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত এবং দলভিত্তিক নৈতিকতার সাথে জড়িত নয়, সেই নৈতিকতা সংখ্যাগরিষ্ঠদের নৈতিকতা হলেও না। রাষ্ট্রের উচিৎ “সংবিধানে” যেই নৈতিকতা প্রকাশ করা হয়েছে শুধু সেটার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা।

এই রায়ের সরাসরি ফলাফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই যে অন্তত দিল্লির পরিসরের ভেতর যৌন সংখ্যলঘুদের উপর চাঁদাবাজী, ব্ল্যাকমেল এবং পুলিশই হুমকি একেবারেই থেমে যায়। পরবর্তি চার বছর ধরে এগুলো কমতে কমতে প্রায় শূন্যতে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু এই শুভ দিনগুলোর মেয়াদ বেশী দিন ছিল না। সুরেশ কুমার কৌশল নামের একজন জ্যোতিষী (যিনি খুব সম্ভবত বাবা রাম দেবের অধীনে কাজ করতেন) দিল্লি উচ্চ আদালতে একটা বিশেষ আবেদন করে যার ফল দাঁড়ায় যে চার বছর আগের রায়টা পুনর্বিবেচনায় আসে। এক পাল নেকড়ের মত পুরা দেশটার বিভিন্ন ধর্মীয় এবং রক্ষণশীল সংগঠনগুলো তখন জ্যোতিষীর সাথে হাত মিলিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শরণাপন্ন হয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সর্বোচ্চ আদালতে জ্যোতিষী কৌশলের আবেদনটির শুনানী শেষ হয়। কিন্তু বিচারকরা তারপরের দেড় বছর মামলাটি নিয়ে কোন মাথা ঘাটায় নি। হঠাৎ একদিন (১১ই ডিসেম্বর, ২০১৩) যেই দিন বেঞ্চে বসা বিচারক সিংভির অবসর গ্রহণ করার কথা, সেই দিন তারা মামলার রায় দিয়ে দিল্লি থেকে আসা আগের রায়টাকে খারিজ করে দিয়ে সমকামিতাকে আবারও অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ৩৭৭কে আবারও আইনের খাতায়ে ফিরিয়ে আনে।

প্রথম থেকেই অনুধাবণ করা যাচ্ছিল যে কৌশলের মামলার রায়টি ছিল কোন শক্ত আইনই বিশ্লেষনের ফসল না হয়ে বিচারকদের বৈরিভাবের একটি প্রকাশ। সেখানে বলা হল যে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ করার কোন প্রয়োজন নেই এবং সংসদ কার্যকর থাকা অবস্থায় আদালতের এখানে কোন এখতিয়ারও নেই। যৌন সংখ্যালঘুদেরকে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আখ্যায়িত করে পুরা সম্প্রদায়কেই অগ্রাহ্য করে ফেলা হয় রায়টিতে। লেখাটি ছিল নিম্নমানের এবং বিচক্ষণতার বাইরে যা ভারত সহ প্রথিবীর অনেক স্থান থেকেই নিন্দার পাত্র হয়ে দাঁড়ায়। দেশটার সর্বোচ্চ আদালতের জন্য এই রায়টা বস্তুত একটা বিব্রতকর এবং লজ্জাকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সেই রায়টা আবারও উলটে দেবার জন্য তৎপর হয়ে উঠে এবং এটি পুনরায় বিবেচনায় আনার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হবার পর সর্বোচ্চ আদালতে কিছু কিউরেটিভ আবেদন দাখিল করে যার লক্ষ্য ছিল আদালত থেকে কিছু আগে পাওয়া রায়টির কোন চুরান্ত পর্যালোচনা করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখা। সর্বোচ্চ আদালত সেই পর্যালোচনা করতে রাজি হয়। আবার ঠিক এই সময়ে আদালতটির দুয়ারে ব্যক্তিগত পরিসর (প্রাইভেসি) নিয়ে পুট্টাসোয়ামীর একটি মামলা চলতে থাকে। ব্যক্তিগত পরিসরের অধিকার নিয়ে রায় দেয়ার সময়ে বিচারপতি চন্দ্রচুদ কৌশলের রায়কে প্রায় উলটে দেন সেটার মধ্যে অন্তর্নিহিত সকল ত্রুটি উত্থাপিত করে। কিন্তু সেখানে ৩৭৭ ধারা প্রধান বিষয় ছিল না, তাই সেই ব্যাপারটা আদালতের আরেকটা বেঞ্চের কাছে হস্তান্তর করা হয় পরবর্তিতে সেটা নিয়ে ব্যবস্থা নিতে।

এত কিছু চলাকালীন কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যারা ৩৭৭ ধারার ফলে নানা ভাবে সরাসরি আক্রান্ত হয়েছেন, তারা সর্বোচ্চ আদালতে হাজিরা দিতে থাকেন বিভিন্ন আবেদন নিয়ে, এবং আদালত কিছুটা বিজ্ঞতা অবলম্বন করে সেই আবেদনগুলো গ্রহণ করে এবং সেগুলোর শুনানী শুনতে সিদ্ধান্ত নেয় আগে দাখিল করা কিউরেটিভ আবেদনগুলোর পূর্বেই। আজ এই মহান দিবসে (৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮) সর্বোচ্চ আদালত সেই আবেদনগুলোর উপরেই রায় দেয়। একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়া হয় যে ৩৭৭ ধারা মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, সমতা এবং ব্যক্তিগত পরিসরের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ (যে পাঁচজনের লড়াইয়ে ভারতে সমকামিতা বৈধ হল)।

যৌন সংখ্যালঘুদের জীবন শুধু মাত্র অপরাধগন্যকারী আইনের দ্বারাই ব্যাহত হয় না। তাদের জীবন ফুলের মত তখনই ফুটে উঠতে পারে যখন তাদেরকে আর বাদ বাকি সকল নাগরিকদের দেয়া সকল অধিকারও দেয়া হয়। এই অধিকারগুলোর মধ্যে বিবাহ, উত্তরাধিকার, বিচ্ছেদ, একত্রে বসবাস, একজন আরেকজনকে রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীণতা, হয়রানি থেকে পরিত্রাণ, তর্জনের (বুলিং) বিরুদ্ধে আইন, সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইন, কৃত্রিম উপায়ে সন্তান নেয়া, বাচ্চা দত্তক নেয়া, সঙ্গীর বীমার প্রতি অধিকার, সঙ্গীর পেনশনের প্রতি অধিকার এবং আরও অনেক অধিকার অন্তর্ভুক্ত।

আদালত ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করার দরজা উন্মুক্ত রেখেছে। আমাদের সম্প্রদায়কে এই সংগ্রামগুলো চালিয়ে যেতে হবে একটা সমকামবিদ্বেষী এবং রক্ষণশীল সরকারের উপস্থিতি মাথায়ে রেখে, যেই সরকার এই সকল অধিকার প্রদানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আওয়াজ তুলতে শুরু করেছে। একটি সম্প্রদায়ের মুক্তি কখনই আন্দোলন ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব হয় নি। নিরপরাধকরণের যুদ্ধটির সময় লাগলো প্রায় ২০ বছর। এখন সময়ে হয়েছে বাকি রণক্ষেত্রের প্রস্তুতি নেয়ার। আমরা একদিন সব অতিক্রম করতে পারবো এবং আমাদের দেশে সকলের সমান স্তর এবং মর্যাদা নিয়ে বাস করতে পারবো। আমাদের বিচার ব্যবস্থা এবং সংবিধান আমাদের আশা, আমাদের অস্ত্র।

Section 377 Verdict: How the Rainbow War Was Won




-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি