সমকামীদের স্বাধীনতার জন্য চাই যুগোপযোগী পদক্ষেপ
নীলয় নীল

২৫ আগষ্ট ২০১৮

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবীকে দেখা হয় গ্লোবাল ভিলেজ হিসেবে। পুকুরে একধারে ঢেউ দিলে যেমন আরেক পাড়ে সেই ঢেউয়ের কিছুটা হলেও প্রভাব পরে তেমনি আজ বিশ্বের একপ্রান্তে একটা বিষয় নিয়ে নারাচারা হলে বিশ্বের অপর প্রান্তেও তার গুণগান ওঠে। আধুনিক এই বিশ্বে শিল্প ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের পাশাপাশি মানুষের কৃষ্টি-কালচার, চলা-ফেরা, ধ্যান ধারণারও পরিবর্তন এসেছে। এক সময়ের প্রচলিত মানবতাহীন বর্বর নিয়ম, প্রথা বা আইন আজ পাল্টে গেছে। মানুষের মধ্যে স্বাধীনচেতা মনভাব বৃদ্ধির ফলে সেকেলে মার্কা বর্বর নিয়ম পদ্ধতি পাল্টে যেতে আজ বাধ্য। আগেকার দিনের মতো গায়ের রং কালো হওয়ার জন্য আজ আর কাউকে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে না। সভ্য সমাজগুলোতে আজ আর নারীদের ছোট করে দেখা হয় না। সতীদাহ ও জাত প্রথার মতো বর্বর প্রথা গুলো আজ বিলুপ্ত। দাস প্রাথাকে আজ সারা বিশ্বব্যাপি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাল্য বিবাহ ও বহুবিবাহের মতো কুপ্রথাগুলো আজ সমাজ থেকে উঠে যেতে শুরু করেছে। মানুষের মূল্যবোধেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

কিন্তু এসব কি এমনি এমনি একদিনে জাদুর কলকাঠির ছোঁয়াতে পরিবর্তন হয়েছে? না, এসব পরিবর্তন আসতে যেমন অনেকটা সময় লেগেছে তেমনি কিছু মানুষকে অনেকটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। যদি আমরা নেলসন ম্যান্ডেলা, হার্ভি মিল্ক, মাদার তেরেসা, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সহ কিছু মনিষীর জীবনী লক্ষ্য করি তাহলে তাদের ত্যাগের মহিমা অনুভব করতে পারব। আজ পশ্চিমা বিশ্বে যৌন স্বাধীনতা অনেকটা স্বীকৃত হলেও এশিয়াসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রে যৌনতাকে এখনও একটা ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। কার বিছানায় কে কাকে সঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করবে, একজন ছেলে একজন ছেলেকে নাকি একজন মেয়েকে, একজন মেয়ে একজন মেয়েকে নাকি একজন ছেলেকে জীবন সঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করবে এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যপার। এখানে অন্য ব্যক্তির নাক গলানো তো দূরের কথা এ নিয়ে রাষ্ট্রেরও মাথা ব্যথা নাই। এটা হচ্ছে উন্নত ও সভ্য সমাজের লালিত আদর্শ।

আমাদের দেশ ঠিক এই আদর্শের বিপরীত। এখানে গুম, খুন, ধর্ষণ ও হত্যাকে যতটা অপরাধ হিসেবে দেখা না হয় তার চেয়েও বেশি অবরাধ হিসেবে দেখা হয় একজন প্রেমিক যুগল একে অপরকে ভালবেসে চুম্বন করলে। এখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রের মধ্যেও যৌনতা নিয়ে সঠিক কোন ধারণা নেই। এখানে কেউ বিজ্ঞান ভিত্তিক সঠিক যৌন শিক্ষার পুস্তক হাতে নিতেও অপরাধবোধে ভোগে। এখানে যৌন শিক্ষা গ্রহণ করা হয় মোকছেদুল মোমেনীন বইয়ের শেষের অধ্যায়, বিবাহিত জীবনের গোপন কথা, স্বামী স্ত্রীর মধুর মিলন সহ আরো কিছু কাল্পনিক এবং সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানীক বইগুলো থেকে। তাই তাদের কাছে যৌনতা মানেই বাচ্চা জন্ম দেয়া, বিপরীত লিঙ্গের সাথে যৌনতাই একমাত্র স্বাভাবিক যৌনতা। এসব ভুল ধারণা আমাদের রক্তে মাংসে মিশে থাকলেও বাস্তবে এই সমাজেই সমকামী, উভাকামী, রুপান্তরকামী এবং উভলিঙ্গ মানুষের অস্তিত্ব ছিল এবং আছে। সামাজিক নানা ট্যাবু ও এসব মানুষের প্রতি প্রচলিত ঘৃণা বিদ্বেষের কারণে তারা বাইরে আসতে পারে নি। গোপনে নানা ভাবে নির্যাতিত হয়ে তাদের জীবন কাটাতে হচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে অপরাধ না করেও শুধু মাত্র যৌন পরিচয়ের কারণে একজন মানুষকে কেন হেনস্তা হতে হবে?

আমি যৌন সংখ্যালঘু মানুষগুলোর কাতারে পরি কি না সেটা বড় কথা নয় বরং একজন মানুষ হিসেবে এইসব অসাম্য এবং প্রচলিত অন্যায়ের বিরুদ্ধ্ব সকলের কথা বলা উচিৎ। আজ লিঙ্গবৈষম্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধিকার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার, পাহাড়ি অধিকার সহ নানা ইস্যু নিয়ে জোড়ালভাবে কথা বলার মতো অনেকেই আছে। কিন্তু যৌন সংখ্যালঘুদের নিয়ে কথা বলার মতো মানুষ নেই বললেই চলে। কিন্তু এই যৌন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নারী, পুরুষ, পাহাড়ি, বাঙ্গালী, ধার্মীক, স্যেকুলার, সকলের মধ্য থেকে হয় অর্থ্যাৎ যৌন সংখ্যালঘু ইস্যুটাও কিন্তু সেই হিসেবে সার্বজনীন। তাই এই ইস্যু নিয়েও জোড়ালভাবে কথা ওঠা বর্তমান সময়ের দাবি এবং এই দাবি পূরণে কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতেই হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অজ্ঞতার চাদরে ঢাকা এই সমাজে কে এগিয়ে আসবে? এই সমাজেও কুসংস্কার আর অজ্ঞতা থেকে মুক্ত গুটি কয়েক সচেতন মানুষ অবশ্যই আছে। হ্যাঁ, সেই গুটি কয়েক সচেতন মানুষেদের নিজ উদ্যোগেই এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সার্বিক কল্যাণে কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। যার সময় আছে তাকে কিছুটা সময় দান করতে হবে, যার মেধা আছে তাকে কিছু জ্ঞান দান করতে হবে, যার অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল তাকে কিছুটা অর্থ দান করতে হবে আবার যার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সাথে ওঠা-বাসা আছে তাকে সেই মহলে এই ইস্যুতে সচেতন করতে হবে, কাউকে যৌনতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সঠিক গবেষণাগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে।

এভাবে সচেতন কিছু মানুষের নানা মুখী কাজের বিনিময়ে সমাজের পরিবর্তন হবে এবং ইতিপূর্বে তা হয়েও এসেছে। বাংলাদেশের মতো পরিবেশে এই রকম ইস্যু নিয়ে কাজ করতে অবশ্যই কিছু পদ্ধতিগত কৌশল নিতে হবে কিন্তু একেবারে থেমে গেলে চলবে না। এখানে ইতিপূর্বে দুটি হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে, এখনকার আাদালত এবং সরকার আমাদের বিপক্ষে, এখানকার ৯০% মানুষ আামাদেরকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তত নয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এখানে যৌন সংখ্যালঘুদের নিয়ে কাজ করা কতটা কঠিন বিষয়। কিন্তু কঠিন বলেই থেমে গেলে সেটা আরও জটিল হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে আমরা বিচ্ছিন্ন ভাবে চেষ্টার দ্বারা তেমন আগাতে পারব না। কারণ এক সময় বাধা প্রাপ্ত হয়ে আমরা নিজেরাই হাঁপিয়ে উঠতে বাধ্য হব। আবার একজন ব্যক্তির দ্বারা সব রকম কাজ করা সম্ভব নয় বরং একটা না একটা খামতি থেকে যাবে। সমাজের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নানা কাজের সমন্ময় করতেই হবে। তাই যৌন সংখ্যালঘু ইস্যুতে সামাজিক পরিবর্নের জন্য একটি সার্বজনীন ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরীর প্রয়োজনীয়তাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না - যে প্লাটফর্মে সমাজের তৃণমূল সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি থেকে শুরু করে দেশ বিদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংস্থাকেও যুক্ত রাখতে হবে এবং প্রত্যেককে তার নিজ নিজ ধাপে নিজ উদ্যোগে প্রয়োজন মতো কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

এখন হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে এসব করে কি বাংলাদেশের মতো একটি মুসলমান রাষ্ট্রের সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে? এই প্রশ্ন করা আর গাছ না লাগিয়েই ফলের আশা করা এক কথা। মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননসহ আফ্রিকার বেশ কিছু মুসলমান রাষ্ট্রে আজ সমকামীরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে, পাকিস্থানের মতো রাষ্ট্রে রুপান্তরকামীরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে, কট্টর খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলো সমকামীদের মেনে নিয়েছে, মালেশিয়ার মতো রাষ্ট্র সমকামীদের পক্ষে কথা বলা শুরু করেছে, সৌদি আরব, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্র ধর্মীয় ইস্যুগুলোতে পরিবর্তন এনেছে, ভারত এবং নেপালের মতো হিন্দু রাষ্ট্রে আজ সমকামীদের অধিকারের আন্দোলন বিজয়ের পথে। এসব রাষ্ট্রের চেয়ে বাংলাদেশ ধর্মীয় দিক থেকে যে বেশি কট্টরপন্থী এটা আমার মনে হয় না।

এখানকার মূল সমস্যা হচ্ছে অজ্ঞতা এবং ভুল শিক্ষা। এখানকার একজন যৌন সংখ্যালঘু ব্যক্তি নিজের যৌন পরিচয়ই সঠিকভাবে জানে না এবং সব সময় নিজে সমকামী কিংবা রুপান্তরকামী হওয়ার কারণে অপরাধবোধে ভোগে। আমরা এই সমস্যাগুলোর সমাধান করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় বিপ্লব ঘটাতে পারি। ইউরোপ আমেরিকার কথা বাদই দিলাম। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সমকামী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই কয়েক বছর আগে আদালত সমকামীদের বৈধতা দিলেও সমাজের মানুষের চাপে আবার অবৈধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। এখন সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা পরিবর্তনের ফলে সরকার, আদালত, হিন্দু, মুসলমান, কোন সংগঠনই সমকামী বিরুদ্ধে উঠে পরে লাগে নি।

আমরা বাংলাদেশের বিগত দিনের এবং বর্তমানে কিছু ঘটনা লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারব আদলের স্বাধীনতা কতটা হাত পা বাধা। আমরা এখনই ৩৭৭ ধারা তুলে দিতে পারব না। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ চেষ্টার দ্বারা সামজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ৩৭৭ ধারার মতো একটি বৈষম্যমূলক আইন উঠিয়ে দেয়ার প্রেক্ষাপট তৈরী করতে পারব। এর জন্য যেমন সময়ের দরকার তেমনি সচেতন মানুষগুলোর আন্তরিকতাও দরকার। তাই সকলের প্রতি আহ্বান, আসুনঃ "আমরা যৌন সংখ্যালঘুরা নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই" - এই মূলমন্ত্র ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে এগিয়ে চলি।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি