"অপ্রাকৃতিক" এক লাগামহীন অস্ত্র
নীলয় নীল

১১ আগষ্ট ২০১৮

একটা বন্দুক দিয়ে একসাথে কত জনকে মারতে পারবেন? বড় জোর দুই, চার, দশ কিংবা এক শত। সবচেয়ে তেজস্ক্রিয় অস্ত্র পারমাণবিক বোমা দিয়ে হয়ত একটি বিশাল অঞ্চল ধ্বংস করতে পারবেন। কিন্তু এই পারমাণবিক বোমা দিয়েও একটি বৃহত্তর সমাজের একটি বিশেষ গোষ্ঠির মানুষকে একেবারে নির্মূল করতে পারবেন না। কিন্তু সেই গোষ্ঠির প্রতি যদি অপ্রাকৃতিক শব্দের সিল লাগিয়ে দিতে পারেন তাহলে পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি কাজ হবে। অপ্রাকৃতিক শব্দটার কাছে কিন্তু পারমাণবিক বোমাও ফেল মারবে। প্রমাণ দেখতে চান? তাহলে অতীত ইতিহাস থেকে একটু ঘুরে নিয়ে আসি। চলেন কয়েক বছর আগের আফ্রিকা এবং পশ্চিমা সাদা চামড়ার দেশগুলোর ইতিহাস মনে করার চেষ্টা করি। কালো অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের দূর্দশা আর পরাধীনতার কথা মনে আছে? নিজের বিবেককেই একবার জিঙ্গাসা করুন তো কালো হওয়া কি অপরাধ?

হয়তো আপনার বিবেক বলবে এটা কখনই অপরাধ হতে পারে না। কিন্তু জানেন কি এই "অপ্রাকৃতিক" শব্দের অস্ত্র দিয়ে কোটি কোটি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে পরাধীন, অবহেলিত ,নির্যাতিত করে রাখা হয়েছিল? সাদা চামড়ার মানুষগুলোর যুক্তি ছিল "প্রকৃতি ওদেরকে কালো চামড়া দিয়ে সৃষ্টিই করেছে কায়িক শ্রম করার জন্য, বুদ্ধি বৃত্তিক কাজের জন্য নয়"। তাদের এই কুযুক্তিকে ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা জওহরলাল নেহরু, আফ্রিকার নির্যাতিত নিপিড়িত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা এবং রাষ্ট্র নায়ক লেনসন মেন্ডেলা, আমেরিকার সফল প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সহ হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ বৃদ্ধাআঙ্গুল দেখিয়েছে। এত গেল পশ্চিমা কাহিনী। এবার ভারতবর্ষে অপ্রাকৃতিক শব্দ ব্যবহার করার একটি উদাহরণ দেয়া যাক। বলুন দেখি নারী হয়ে জন্ম গ্রহণ কি অপরাধ? নিশ্চয় না। কিন্তু এই ভারতবর্ষেও সাধারণ মানুষ তো বটেই রবীন্দ্রনাথের মতো অসাধারণ ব্যক্তিও যুক্তি দিত "প্রকৃতি নারীকে বাহিরে কাজের জন্য সৃষ্টি করে নি, যদি বাহিরে কাজের জন্যই উপযোগী করত তাহলে পুরুষের মতো বলিষ্ট শরীর দিত"।

প্রকৃতির ঘাড়ে বন্দুক রেখে নারীকে কপালে টিপ, হাতে চুড়ি, শরীরে বোরখা পেচিয়ে ঘরের মধ্যে অবরোধ বাসিনী করে রাখা হল। এই অবরোধ থেকে বেড়িয়ে আসতে রোকেয়া, সুফিয়ার মতো হাজার নারীকে বাধ ভাঙ্গার আওয়াজ তুলতে হল। আজ মাঠের কাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা এমন কি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান "নাসা" তেও নারীরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। সঠিক সুযোগ পেলে নারীরা যে পুরুষের তুলনায় কোন অংশে কম নয় এটা দেখিয়ে দিয়েছে। প্রকৃতির দোহাই দিয়ে এ রকম শত শত কুযুক্তি এখনও আছে। এ রকমই একটি সারা বিশ্ব ব্যপি প্রচলিত কুযুক্তি হচ্ছে "নারী পুরুষের কামই একমাত্র প্রাকৃতিক, কারণ এই কামে বাচ্চা উৎপাদন হয়, সমকাম কখনই প্রাকৃতিক হতে পারে না"। আরও একটি হচ্ছে "সমকামীদের বৈধতা দিলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে, পৃথিবী জনশুন্য হয়ে পড়বে"। কুসংস্কারচ্ছন্ন অন্ধ সমাজের মানুষের কাছে তো বটেই কিছু ধর্মনিরপেক্ষ তথাকথিত সুশীল সমাজের ব্যক্তির কাছেও এ রকম বক্তব্য নতুন কিছু নয়। সেই যে কবে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষীয়দের মাথায় "প্রকৃতি বিরুদ্ধ" নামে একটা কথা ঢুকিয়ে দিয়ে গেল, ব্রিটিশরা নিজেদের মাথা থেকে প্রকৃতির দোহাই পারা ঝেটিয়ে বিদায় করতে পারলেও ভারতবর্ষীয়রা আজও পারল না।

আজ তথাকথিত প্রকৃতি প্রেমীরা কথায় কথায় প্রকৃতির দোহাই পারে। যদিও এই সব ব্যক্তিরা আসলে প্রকৃতি কি এটাই ভাল করে জানে না। আমিও যেন ভুলে গেছি। ভুলবই না বা কেন! যখন প্রকৃতির নিয়ম নীতি মানুষে নির্ধারণ করে দেয় সেটা আর প্রকৃতি থাকে কেমনে? আর প্রকৃতি নিজেই যদি তার নিয়ম নীতি নির্ধারণ করে তাহলে সমকামীদের প্রকৃতি বিরুদ্ধ বলার অধিকার এসব মানুষেরই বা কতটুকু থাকলো? মনুষ্য রচিত প্রকৃতির কথা যদি বলি তাহলে সংখ্যা গরিষ্ঠতার দাপটে সমকামীদের প্রকৃতি বিরুদ্ধ তকমা লাগিয়ে দিতেই পারেন। আর স্বাধীন প্রকৃতির কথা যদি বলি তাহলে সমকামীদেরকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ তকমা লাগিয়ে দেয়ার আপনি কে? যখন হাজার বছর ধরে প্রকৃতিই সমকামীদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে সেখানে আপনার এই নির্বাচন কতটুকু যুক্তি সংগত একবার বিদ্বেষমুক্ত মনে ভেবে দেখার দাবি রইল। সেই প্রাচীন মানব সভ্যতা,গ্রী ক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, সাইবেরিয়, আরবিয় কিংবা সিন্ধু সব সভ্যতাতেই প্রকৃতি সমকামীদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছিল আজও রেখেছে ভবিষ্যতেও রাখবে।

সমকামীদের থেকেই যে সমকামী জন্ম নিতে হবে তা নয় বরং আপনাদের মতো সমকামভীতদের থেকেও সমকামী জন্ম নিতে পারে। তখন কি করবেন একবার ভেবেছেন কি? আমার নিজের গ্রামেই এক সমকামভীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে উভলিঙ্গত্ব (যোনি এবং পুরুষাঙ্গেরর একই সঙ্গে অবস্থান) শিশু। নবজাতক এই শিশুকেও তার লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে অপ্রাকৃতিক ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে সামাজিক ভাবে হেনস্থা করা হবে। কিন্তু ঘৃণা করেন কিংবা নাই মানেন এটাই ছিল প্রাকৃতিক নির্বাচন। আসলে যা আমরা সচারচর দেখি না কিন্তু প্রকৃতিতে বিদ্যমান থাকলেও তার গায়ে অস্বাভাবিক অপ্রাকৃতিক ট্যাগগুলো লাগিয়ে দেই। কালো কাক দেখতে দেখতে অভ্যস্ত মানুষগুলো যদি কখনও সাদা কাক দেখে তাহলে সেই কাককেও যে জেল হাজতে পুরবে না এমনটা নিশ্চয়তা যেন আজ দিতে পারি না। মানুষ আইন-আদালত, নিয়ম নীতি যা করেই প্রকৃতির লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করুক না কেন প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য থাকবেই। আর এসব বৈচিত্র্যেরও রয়েছে নানা উপযোগীতা। সমকামিতার প্রাকৃতিক উপযোগীতা নিয়ে লিখতে বসলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারব।আজকের লেখাকে আর সে দিকে নিয়ে যাব না।একদিন আলাদাভাবে সমকামিতার প্রকৃতিক উপযোগিতা নিয়েই লিখব। কিন্তু কষ্ট করে লিখেও তথাকথিত প্রকৃতি প্রেমে উন্মাদ মানুষগুলোর বোধ ফেরাতে পারব বলে মনে হয় না। কারণ সামন্যতম বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ হলেও শুধু মাত্র বাচ্চা উৎপাদন না হওয়ায় কি করে সমকামিতাকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ বলতে পারে? যৌনতা কি শুধুই বাচ্চা উৎপাদনের মাধ্যম? যদি তাই হয় তাহলে কন্ডম কিংবা জন্ম নিয়ন্ত্রণ ট্যবলেট ব্যবহারের দরকারই বা কি? বরং বছরে বছরে বাচ্চা জন্ম দিয়ে প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করুন। পৃথিবী থেকে সমস্থ্য বন্ধ্যা, উভলিঙ্গ মানব, হিজরা এবং সমকামীদের বিদায় করে দিয়ে আপনারাই বছর বছর বাচ্চা জন্ম দিয়ে প্রকৃতির সেবা করুন।

৫ থেকে ১০% সমকামীকে বৈধতা দিলে আপনারা বাকি যে ৯০ থেকে ৯৫% বিষমকামী আছেন সবগুলোর বাচ্চা জন্ম দেয়া বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে পৃথিবী জনশুন্য হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। শিক্ষিত মানুষ হয়ে মূর্খের মতো উদ্ভট আর অযৌক্তিক দাবি করতে একটু বাধে না আপনাদের। প্রকৃতিকে সমৃদ্ধ করতে করতে এতটাই সমৃদ্ধ করছেন যে বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত হাওয়া করে দিয়ে আমাদের পৃথিবীকে রক্ষাকারী ওজন স্তরের বারটা বাজিয়ে দিয়েছেন। প্রকৃতির প্রতি আপনাদের এই মহান খেদমতি কাজে খুলনার সমকামী সাজ্জাদ অংশ নিতে চায়নি বলে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছিলেন আপনারা - লেসবিয়ান সানজিদাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল আপনাদের সমাজ ব্যবস্থা। এ রকম হাজার হাজার সাজ্জাদ, সানজিদারা আপনাদের সংকীর্ণ মানসিকতার সমাজের কারণে নির্যাতিত।

কিন্তু কেন? আমরা তো আপনাদের স্বাধীনতায় বাধা দিতে যাইনি কিংবা সমকামী হতে বলি নি।তাহলে কেন আপনারা আমাদেকে নানা ট্যাগ লাগিয়ে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছেন? আমরা চিৎকার করে বলতে চাই আমরাও আপনাদের মতো মানুষ, আমাদেরও আবেগ অনুভূতি আছে, আমাদের ভালবাসাকে কেড়ে নিলে আমাদেরও কষ্ট হয়, আমরাও সম্মানের সহিত বুক ভরা নিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চাই, আমরা আমাদের মতো থাকতে চাই। আমাদের বাঁচার এই আকুতি যদি আপনার কাছে অপরাধ মনে হয় তবে চলে আসুন, বুক পেত দেব, তিলে তিলে মারার চেয়ে গুলিবিদ্ধ করে একেবারেই মেরে ফেলুন। আমাদেরকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ বলার আগে একবার ভেবে দেখুন তো বিলাসিতার জন্য যে গাড়ি ব্যবহার করছেন, দালানকোঠা তৈরীর জন্য যে ইট ভাটা তৈরী করেছেন, নানা কলকারখানা স্থাপন করেছেন সেগুলো কতটা প্রকৃতি বান্ধব। পারবেন কি আইন করে, নিয়ম নীতি তৈরী করে এগুলো বন্ধ করতে? যদি পারেন তবে স্যেলুট আপনাকে।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি