ধর্ম, বিজ্ঞান এবং সমকামিতা
নীলয় নীল

১১ আগষ্ট ২০১৮

আপনি সমকামীদের ঘৃণা করেন, করতেই পারেন, সেটা আপনার ব্যাপার। আমি সমকামী, আমি কাকে জীবন সঙ্গি হিসেবে বেছে নেব, কার সঙ্গে থাকব সেটা আমার ব্যাপার। আমাকে আপনার ঘৃণা লাগলে আমার কাছ থেকে দূরে থাকবেন আমিও আপনাকে এড়িয়ে চলব। ব্যাস মিটে গেল। কিন্তু না! মাঝে মধ্যেই আমার পোষ্টে (রাতের বেলা গেলমান খুজে বেড়ায়, দিনের বেলা পরম ধার্মিক) কিছু ব্যক্তির প্রথমে ওয়াজ নসিহত, তারপরে কাল্পনিক ভয় দেখানো (পাথর বৃষ্টি দিয়ে মারবে, দেশটাকে তুলে আছার দিয়ে মাটির নিচে পুতে দেবে, মরার পর ক্যালাবে ইত্যাদি), তারপর কাল্পনিক ভয় দেখানোর উপর নিজেই আস্থা না রাখতে পেরে নিজেই এবার ভয়ঙ্কর রুপ ধরে গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, চাপাতি দিয়ে মাথা কেটে নেয়ার হুমকিসহ নানা রকম মন্তব্য করে। এতে যদি আমি বিজ্ঞান ভিত্তিক কিছু বলতে যাই তাহলে উক্ত ব্যক্তিগণ অনুভূতিতে আঘাত পেয়ে কাতরাতে কাতরাতে বিজ্ঞানের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করতে লেগে যায় (অথচ যে ফেসবুক ব্যবহার করে এসব করছে সেই ফেসবুকও একজন অধার্মিক ব্যক্তির আবিষ্কার করা)। তাই অনুভূতিধারী উক্ত ব্যক্তিরা অনুভূতিতে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও আজ ধর্ম, বিজ্ঞান এবং সমকামিতা নিয়ে বিশদভাবে লিখতেই হচ্ছে।

ধর্ম

প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষই নিজের ধর্মকে সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর প্রদত্ত বলে দাবি করে আর বাকিগুলো হয়ে ওঠে ভ্রান্ত। এভাবে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের দাবিগুলো মেনে নিতে গেলে হাজার হাজার ঈশ্বর তৈরী হয়ে যায়। কারণ পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্ম প্রচলিত আছে। এসব ধর্মের মধ্যেও আবার হাজার হাজার শাখা।এক ধর্ম তো আরেক ধর্মকে জাহান্নামী/নরকবাসী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। সেই সাথে নিজ ধর্মের মধ্যেই এক শাখা আরেক শাখাকে ভ্রান্ত, জাহান্নামী, নরকবাসী, শয়তান, অসুর ইত্যাদি নানা রকম বিদ্ধেষপূর্ণ সম্ভাষণে ভূষিত করে। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের রক্তারক্তি, লুটপাট, ছিনতাই, ডাকাতি, যুদ্ধ তো ঘটেছেই সেই সাথে নিজ ধর্মের এক শাখার সাথে অন্য শাখার যুদ্ধ, লুটপাটও কিন্তু বিরল নয় বরং এক সময়ে নিত্য দিন ঘটে যাওয়া ঘটনা। এত হাজার হাজার ধর্ম এবং শাখাগুলোর মধ্যে কোনটা যে সঠিক এটা খুঁজতে খুঁজতে আমাদেরকে তিনবার মরতে হবে আবার তিনবার জন্ম নিতে হবে। তবুও হয়ত কোন ধর্মের আগা মাথা পাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ যে যুক্তি প্রয়োগ করে আমরা অন্য ধর্মকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করছি সেই একই যুক্তি প্রয়োগ করলে কিন্তু আমার নিজ ধর্মও রসাতলে যাবে। এভাবে নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করলে দেখা যাবে কোন ধর্মই অসঙ্গতি থেকে মুক্ত নয়। অতএব কোন অসঙ্গতিপূর্ণ ধর্ম ইশ্বর প্রদত্ত হতেই পারে না - এটা কিন্তু ধার্মিকদের দাবি থেকেই বলা যেতে পারে। ধর্ম যে সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর পদত্ত কোন বিষয় নয় এটা আরও একটি বাস্তব উদাহারণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি।

কিছু দিন আগে তাইওয়ানের এক বন্ধুর সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম তার ধর্মের নাম তাওবাদ। আমি তো অবাক। কারণ আমি তাওবাদ ধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানি না। একই রকম সে যখন ইসলাম সম্পর্কে জানল সেও অবাক। কারণ সেও ইসলামের নাম শুনেনি। এখন সে যদি তার ধর্ম অনুসারে আমাকে পাপী এবং নরকবাসী হিসেবে দাবি করে তবে তার জন্য আমি যতটা না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী তার ধর্মের ইশ্বর বা তাওবাদের প্রবক্তা। আবার আমি ইসলাম, হিন্দু বা খৃষ্টান ধর্ম অনুযায়ী তাকে জাহান্নামী বা নরকবাসী হিসেবে তুলে ধরলে তার জন্য সে যতটা না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায়ী ইসলাম, হিন্দু, খৃষ্ট ধর্মের ইশ্বর বা ধর্মীয় প্রবক্তদের। কারণ ইশ্বর, আল্লাহ বা ভগবান তার একমাত্র ধর্ম সারা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবী ব্যাপী ধর্ম প্রচারের কথা কল্পনা করা গেলেও আজ থেকে ৫ হাজার, ৩ হাজার, ২ হাজার এবং ১৪ শো বছর আগের কথা কল্পনা করুন। তখন একদেশ থেকে আরেক দেশে ধর্ম প্রচার ছিল অনেক কঠিন বিষয়। তাহলে সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত যে মানুষগুলো ইসলাম, হিন্দু, খৃষ্টান ইত্যাদি ধর্ম সম্পর্কে জানেই না অথচ সারা জীবন উক্ত অঞ্চলের প্রচলিত ধর্ম পালন করেছে কিংবা ধর্মহীন থেকেছে কিন্তু ভাল কাজ করে মারা যাওয়ার পরেও এসব ধর্ম মতে তাদেরকে জাহান্নামী বা নরকবাসী হিসেবে চিহ্নত করা কতটুকু যৌক্তিক? একবার ভেবে দেখেছেন কি?

কোন ধর্ম যদি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত হয় তাহলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার হিসেবে মাত্র ৫ থেকে ১০% মানুষ স্বর্গ বা জান্নাতে যাবে বা বাকি ৯০ থেকে ৯৫% মানুষ নরক বা জাহান্নামে যাবে। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবেই যে ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান সারা পৃথিবী ব্যাপী নিজ ধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অক্ষমতার কারণে নিরপরাধ ৯০ থেকে ৯৫% মানুষকে শাস্তি দিবে সে কি করে পরম দয়াময় সম্ভষণে ভূষিত হতে পারে। আর আমরা যাকে সৃষ্টি কর্তা কল্পনা করে নানা রকম গুণবাচক ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছি সেগুলো কি আসলেই যৌক্তিক? আমাদের কল্পিত সৃষ্টিকর্তা কি আসলেই সর্বশক্তিমান, পরম দয়ালু, সর্বদ্রষ্টা এই গুণগুলোতে ভূষিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে? যুক্তি এবং বাস্তবতা দিয়ে পরীক্ষা করে নেয়া যাক। যেমনঃ একটি ক্ষুধার্ত সাপ একটি নিরীহ ব্যাঙকে খাচ্ছে। সাপ আল্লাহ, ঈশ্বর বা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছে তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য আর ব্যাঙ প্রার্থনা করছে তাকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য। এই অবস্থায় কল্পিত সৃষ্টিকর্তা যদি ব্যাঙকে বাঁচিয়ে দেয় কিংবা বাঁচিয়ে না দিয়ে সাপকে খেতে দেয় তবুও সে পরম দয়ামত হতে পারে না। কারণ তাকে কাউকে না কাউকে অসন্তুষ্ট রাখতে হবেই। আবার বন্যা, জলোচ্ছাস, দূর্ভিক্ষসহ নানা দূর্যোগে হাজার হাজার মানুষকে (বিশেষ করে শিশু) হত্যা করে কখনই একজন পরম দয়াময় হতে পারে না।

যখন একজন শিশু ধর্ষিত হল সেটা দেখে থামানোর বদলে যদি উপভোগ করে তবে তিনি কখনই সৃষ্টিকর্তা কিংবা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য হতেই পারেন না আর যদি না দেখেন তবে তিনি সর্বদ্রষ্টাও হতে পারেন না। আবার কল্পিত ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান যদি সর্বশক্তিমান হন তবে তিনি কি পারবেন এমন একটি পাথর তৈরী করতে যেটা তিনি নিজেই বহণ করতে অক্ষম? উত্তর যেটাই হোক এক্ষেত্রেও সেই কল্পিত ঈশ্বর, আল্লাহ, ভগবান সর্বশক্তিমান হতে পারবেন না। যাকে আমরা সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিকর্তা বলে মুখে ফেনা তুলি তিনি কি সর্ত্যিই আছেন কিংবা সত্যিই কিছু সৃষ্টি করেছেন? তিনি কি পারবেন মানুষের সাহায্য ছাড়া একটি বাচ্চা জন্ম দিতে? তিনি কি পারবেন প্রত্যক্ষভাবে কিছু সৃষ্টি করে দেখাতে? না, পারবেন না কারণ তিনি বলে যে আদৌ কিছু আছে তারই কোন যৌক্তিক এবং বাস্তব ভিত্তি নেই। সেই যে ছোটবেলা থেকে তো নানা ধর্মের নানা গালগল্প শুনেছেন, কোন প্রশ্ন ছাড়াই বিশ্বাসও করেছেন, এবার একটু সেই গল্পগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন তাহলেই ধর্ম এবং ঈশ্বরের আসল স্বরুপ বুঝতে পারবেন।

আপনার অবচেতন মন হয়ত প্রশ্ন করতেই পারে ঈশ্বর যদি সত্যিই না থাকে তাহলে আমরা এবং এই মাহাবিশ্ব কে তৈরী করল? সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে আপনি এটা ভেবে বসে আছেন যে আমরা এবং এই মহাবিশ্ব কোন প্রভাবশালী সত্তার হুমকের মাধ্যমে ঘটে যাওয়া একদিনের ঘটনার ফসল। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে এই মহাবিশ্ব ও জীব বিশাল সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ক্রিয়ার ফসল। এই সমস্ত ক্রিয়া সম্পাদন হতে কোন কাল্পনিক প্রভাবশালী সত্তার আমদানী করা কোন যৌক্তিকতা নেই। কারণ মহাবিশ্ব তৈরীর ক্রিয়াগুলোর সম্পাদনকে যদি মনে নিতে না পেরে একটি কাল্পনিক প্রভাবশালী সত্ত্বার আমদানী করি তাহলে সেই প্রভাবশালী সত্ত্বার নিজে নিজে তৈরী হওয়াকে কোন যুক্তিতে মেনে নেব? (মহাবিশ্ব ও জীব নিয়ে বিস্তারিত জানতে অভিজিৎ রায়ের লেখা ১) আলো হাতে চলিয়াছে আধারের যাত্রী, ২) শুন্য থেকে মহাবিশ্ব, ৩) মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোজে বইগুলো পড়ুন)।

ধর্ম তাহলে কি?

ধর্ম হচ্ছে মানব মনে লালন করা কিছু কাল্পনিক বিশ্বাস। মানুষ যখন প্রকৃতিতে নানা ঘটনা দেখতো কিন্তু তার উত্তর খুজে পেত না তখন এক ধরণের কাল্পনিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা চালাত। এই সমস্ত কাল্পনিক ব্যাখ্যাগুলো এক সময় প্রতিষ্ঠিত ধর্মে রূপ নেয়। আমরা যদি প্রথম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধর্মগুলোর সামাজিক বিবর্তন লক্ষ্য করি তাহলেই ধর্মকে বুঝতে পারবো। টোটেম, প্যাগানিজম, বহু ঈশ্বরবাদ এবং একেশ্বরবাদ। টোটেমবাদ অনেক প্রাচীন একটি ধারণা। টোটেমদের মধ্যে ধর্মের বিস্তারিত কোন ধারণা ছিল না। তারা প্রথম মৃত্যুর পরে মানুষের আবার ফিরে আসা এবং আত্ম নিয়ে ভাবতে শুরু করে। মৃত ব্যক্তি অশরীরী আত্মা হয়ে ফিরে আসে, সন্তুষ্ট হলে উপকার করে আর অসন্তুষ্ট হলে ক্ষতি করবে এসব ধারণা করেই তারা আত্মকেন্দ্রীক কিছু নিয়ম পালন করত। বিশেষ করে দক্ষ শিকারী ও গোষ্ঠি প্রধানদের মৃত্যর পর আত্মার সাহায্য লাভের জন্য বেশ কিছু নিয়ম পালন করত। এর পরেই আত্মা কেন্দ্রীক টোটেমবাদ আরও বড় পরিসরে রূপ নিয়ে প্রকৃতির নানা প্রভাবশালী বস্তুকে ভয় এবং পূজা শুরু করে। যাকে আমারা প্যাগানিজম বলি।

মানুষ যখন আগ্নেয়গিরির আগুনের ভয়াবহতা, সূর্যের শক্তি, চাঁদ, বাতাস, পাহাড়, বড় গাছ সহ নানা জিনিসের শক্তি কল্পনা করে সেগুলোকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য নানা নিয়ম ও আচার অনুষ্ঠান পালন করা শুরু করে। তারপরেই প্রকৃতির এই সব জিনিসের একজন করে নিয়ন্ত্রণকর্তা কল্পনা শুরু করে মানুষ। যেমনঃ সূর্যদেব, বরুণদেব, অগ্নিদেব, বনদেবী, পবনদেব ইত্যাদি। ফলে প্রকৃতি পূজার পাশাপাশি শুরু হয়ে এসব দেব দেবীর পূজা। এর পরেই গ্রীক ধর্ম একেশ্বরবাদের প্রক্রিয়া শুরু করে। গ্রীক ধর্মে দেখা যায় সব দেবতাকে পরাজিত করে দেবতা জিউস এর প্রভাব। গ্রীক ধর্মের পরেই ইহুদী ধর্ম পুরোপুরীভাবে একেশ্বরবাদ চালু করলেও টোটেম এবং প্যাগানিজম এর প্রভাব থেকে একেবারে বেরিয়ে আসতে পারে নি। এজন্যই ওল্ড টেস্টামেন্টে দেখা যায় বাইতুল মুকাদ্দাসের কিছু জায়গাকে পবিত্র গণ্য করা ,বাইতুল মুকাদ্দাসের মধ্যে সিন্দুক করে তাকে পবিত্র বস্তু মনে করে ঘিরে ধরে আরাধনা করা। ইহুদী ধর্মকে আরেকটু রং চং করে সামন্য কিছু পরিবর্তন করে ও পরিবর্ধন করে খৃষ্টান ধর্ম চালু হয়।

ইহুদী ধর্মের সেই পবিত্র সিন্দুকের প্রভাব খৃষ্ট ধর্মে এসে মিলিয়ে গিয়ে সব প্রভাব প্রতিপত্তি দেয়া হয় পিতা এবং পুত্র অর্থ্যাৎ ঈশ্বর এবং যীশুকে। তবুও টোটেম, প্যাগান, বহুঈশ্বরবাদের কিছুটা ছোয়া থেকেই যায়। এর পরেই খৃষ্ট ও ইহুদী ধর্মের সমন্ময় করে কিছু নিয়ম বাদ ও কিছু নিয়ম যোগ করে ইসলাম ধর্ম চালু হয়। যারা বাইবেলের ওল্টটেস্টামেন্ট এবং নিউটেস্টামেন্ট পড়েছেন এবং ইসলাম ধর্মের কুরআন, হাদিস ও বিশেষ করে তাফসিরগুলো পড়েছেন তারাই এর সত্যতা নিজেই যাচাই করতে পারবেন। ইসলাম ধর্মেও সেই টোটেমবাদের আত্মার ধারণা,প্যাগান ধর্মের বস্তুর প্রভাবের ধারণা হিসেবে হাজরে আসওয়াদ পাথরকে সম্মান করা, বহুঈশ্বরবাদের প্রভাব হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তির বিশেষ সম্মান দান করার রীতি আজও বিদ্যমান। ধর্মগুলোর বিবর্তনের সময় এবং অঞ্চলগত প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ধর্মগুলোর মধ্যে উক্ত অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভিন্ন প্রকৃতির নিয়ম তৈরীতে বাধ্য করেছে। যেমন ভারতবর্ষে (বহুঈশ্বরবাদের বিবর্তিত রূপ) সনাতন ধর্মে পিঠা, পায়েস, দুধ, দই, ঘী, জল, ফুল সহ নানা উপকরণ দিয়ে পূজা করা হয়। আবার মধ্যপ্রাচ্যর মরু এলাকার ধর্ম ইহুদী,খৃষ্ট ও ইসলাম ধর্মে পশু উৎসর্গের মাধ্যমে আরাধনা করা হত। কারণ উক্ত এলাকার দুধ, জল এসব উপকরণ অতটা সহজলভ্য ছিল না। এটা তো গেল বিশাল দূরত্বের পরিবেশের উদাহরণ। একটি দেশের মধ্যেই আলাদা আলাদা অঞ্চলে একই ধর্মের মধ্যে নানা রকম পরিবর্তন দেখা যায়। সব মিলিয়ে সুষ্ঠভাবে বিবেচনা করলে এটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় ধর্ম হচ্ছে বহুদিন থেকে চলে আসা মানব মনের নানা কৌতুহল মেটানোর কাল্পনিক মাধ্যম।

বিজ্ঞান

বিজ্ঞান হচ্ছে বিশ্বাসের বিপরীতে কোন বিষয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রমাণ যাচাই করে গবেষণার মধ্যমে প্রাপ্ত উক্ত বিষয়ের বিশদ বিবরণ। ধর্মে সংশয় এবং প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নাই বরং ধর্মীয় প্রবক্তরা আপানে যা গিলাবে বিনা বাক্যে তাই গিলতে হবে কিন্তু বিজ্ঞান সংশয় ও প্রশ্নের মাধ্যমেই চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে। ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এখানেই। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে একটি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান পরিবর্তন হয় না। যেমনঃ পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। যে কোন গবেষণাগারে যে কোন ব্যক্তি গবেষণা করলে ফলাফল একই হবে। কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে দেখা যাবে নানা মুনির নানা মত। তাই বিজ্ঞান সর্বজনীন কিন্তু ধর্ম সর্বজনীন নয়। নিউটন, গ্যালিলীয়, আইনস্টাইন বিজ্ঞানীগণও যদি কোন কিছু দাবি করেন তবুও তাদেরকে দাবির স্বপক্ষে তথ্য প্রমাণ দিতে হবে কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে পীর, দরবেশ, মোল্লা, বাবা, পুরোহিত, পোপ, পাদ্রী সত্য মিথ্যা যা বলবে কোন রকম সংশয় কিংবা প্রশ্ন ছাড়া তাই মেনে নিতে হবে। এসব কারণে আমার কাছে বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো ধর্মের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।

কিছু পাবলিকের দাবি বিজ্ঞান নাকি ধর্ম থেকে এসেছে। তা কোন ধর্ম থেকে এবং ধর্মগ্রন্থের কোথা থেকে কি কি আবিষ্কার হয়েছে তা বলার মতো ক্ষমতা এসব পাবলিকের নাই। আসলে এরা না জানে ধর্ম না জানে বিজ্ঞান। যদি ধর্মে সামান্যতম বিজ্ঞান থাকত তাহলে প্রতিটি মোল্লা, পুরোহিত, পোপ, পাদ্রী হয়ে উঠতো একজন মহা তাবত তাবত বিজ্ঞানী। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রায় সব বিজ্ঞানী ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মহীন। আর ধর্মীয় নেতারা হচ্ছে অপবিজ্ঞানের জনক। কিছু উদাহারণও দিয়ে দেই। পৃথিবীকেন্দ্রীক ধারণার বিপরীতে সৌরকেন্দ্রীক ধারণা তুলে ধরার কারণে মহান বিজ্ঞানী গ্যালিলীয়র প্রতি অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায় খৃষ্ট ধর্ম নেতারা। শুধু তাই নয় বিজ্ঞানী ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। ইহুদী ধর্মগ্রন্থ ওল্ডটেস্টামেন্টের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদ পড়লেই বুঝতে পারবেন ধর্ম কতটা বিজ্ঞান বিরোধী। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মও অপবিজ্ঞান ছড়ানোর কাজে পিছিয়ে নেই। সমস্থ ধর্মের সৃষ্টি তত্ব, আত্মার ধারণা, পৃথিবীকেন্দ্রীক মহাবিশ্বের বিপরীতে বিজ্ঞানের অবস্থান। এভাবে শত শত উদাহরণ দেয়া যাবে। তাই ধর্মে বিজ্ঞানের সন্ধান আর নিম গাছে আমের সন্ধান করা একই কথা।

সমকামিতা

এই কলামের নামের সাথে উপরোক্ত আলোচনাগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু সমকামিতা নিয়ে কথা বলার আগে ধর্ম ও বিজ্ঞান বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করেছি। কারণ সমকামিতা নিয়ে কথা উঠলেই কিছু ধার্মীক ব্যক্তি নাক সিটকাইতে সিটকাতে ঠিকই চলে আসবে। আর এসেই শুরু করবে সেই চিরাচরিত ধর্মীয় কাল্পনিক ভীতি প্রদর্শন। তাদের এই সব কাল্পনিকতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ভিত্তিক কথা বললে বিজ্ঞানকেই তারা অচ্ছুৎ বানিয়ে ফেলে। তাই সমকামিতা নিয়ে কথা বলার আগেই ধর্ম কি এবং বিজ্ঞান কি তা তুলে ধরার প্রয়াস করা হয়েছে। যাই হোক,এখন সমকামী ও সমকামিতা নিয়ে কথা বলা যাক। সমকামিতা যে বিষমকামিতার মতই স্বাভাবিক একটি যৌন প্রবৃত্তি বর্তমান সময়ে এটা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন অনেক আগেই সমকামিতাকে রোগের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। ইদানিং সমকামিতা ও সমকামীদের নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং প্রায় সব বৈজ্ঞানিক গবেষণা পত্রেই সমকামিতাকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখা হয়েছে। শুধু তাই নয় পশু পাখিদের মধ্যেও ১৩ শত এর উপরে প্রজাতির মধ্যে সমকামিতা পাওয়া গেছে।

এসবের পরেও যারা সমকামিতাকে এখনও মানসিক বিকৃতি, অপ্রাকৃতিক হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত তারা ঠাকুমার ঝুলির (কাল্পনিক গল্পের বই) অতীতের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ১৪০০ বছর পিছয়ে যান। সমকামিতা যদি মানসিক বিকৃতি হয় তাহলে যৌক্তিক কারণে বিষমকামিতাও মানসিক বিকৃতি। কারণ বিষমকামী হওয়ার জন্য বিষমকামিতা করে আপনাকে যেমন বিষমকামী হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি তেমনি একজন সমকামী ব্যক্তিকেও সমকামিতা করে সমকামী হিসেবে গড়ে তুলতে হয় নি। শরীরবৃত্তীয় কারণে আপনি যেমন বিষমকামী একই কারণে আমিও সমকামী। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে দেখলে আপনার মধ্যে নানা অনুভুতি জাগে কিন্তু আমার ঠিক উল্টো অর্থাৎ সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি অনুভূতি জাগে। আপনার মতই আমিও মানুষ, আপনার পাশেই একই পরিবেশে বড় হয়েছি, তবুও আপনার যৌন জীবন থেকে আমার যৌন জীবন ভিন্ন। যদি কখনও নিরপেক্ষ মন নিয়ে এই ভিন্নতার সঠিক কারণ খুঁজতেন তবে হয়তো সমকামীদের প্রতি বিদ্বেষের বদলে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু না সেই কবে কে আমাদের বিরুদ্ধে গল্প লিখে গেছে সেগুলো পড়েই সমকামীদের প্রতি আপনার তীব্র ঘৃণা অথচ কখনও সমকামীদের জানতে কিংবা বুঝতে চাননি।

আমি আপনাকে ধর্মহীন হতে বলছি না বরং আপনার ধর্মকে মানবিক হতে বলছি। মানব কল্যাণই যদি ধর্মগুলোর দাবি হয়ে থাকে তাহলে ধর্মে অবশ্যই মানবিকতা আনতে হবে,সময়ের প্রয়োজনে করতে হবে সংস্কার। ধর্মগুরুরা কেউ ৫ হাজার, কেউ ৩ হাজার, কেউ ২ হাজার আবার কেউ বা ১৪ শো বছর পিছিয়ে যেতে চায়। কিন্তু এটা বাস্তবতা আর কাল্পনিকতা দিয়ে বাস্তবতা চলে না। তাই ধর্মগুরুদের তীব্র বাধা সত্বেও সময়ের সাথে ধর্মে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এক সময় সতীত্ব রক্ষার নামে জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা, বর্ণ প্রথার নামে সমাজের একটি বিশাল জনগোষ্ঠিকে অবহেলিত করে রাখা, ডাইনি তাড়ানোর নামে খৃষ্ট ধর্মগুরুদের দ্বারা হাজার হাজার নারী নির্যাতন, ইসলাম ধর্ম সমর্থীত দাস প্রথা, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ, লিঙ্গ বৈষম্য, নারীদের অবরোধ বাসিনী করে রাখা, ধর্মগুরুদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখল করে অন্য সংখ্যালঘু ধর্ম ও মতের মানুষের প্রতি নির্যাতন সহ নানা রকম ধর্মীয় পবিত্র অন্যায়গুলো আজ আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর জন্য অবশ্য অনেক কাঠখড়ও পোড়াতে হয়েছে।

একদিন সমকামীরাও তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে নিতে বেড়িয়ে আসবে। হায়েনাদের রক্ত পিপাসা মেটাতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেবে। সেই রক্তের বন্যায় ভেসে আসবে স্বাধীনতা। সেই দিন পর্যন্ত ধর্মগুলো সমকামবিদ্বেষী মনোভাব অব্যাহত রাখলে চীন, জাপান, ব্রিটেন, জার্মানী, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে ধর্ম যে রকম অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, এ দেশগুলোতেও সেই রকম অবস্থা তৈরী হতে বেশি দিন সময় লাগবে না। কারণ সমকামীদের বিরুদ্ধে যতই আইন করেন, যতই বিদ্বেষ ছড়ান তবুও প্রকৃতির এই নিয়মকে আটকাতে পারবেন না। বরং প্রতিটি সমমকামী যখন বিনা কারণে নিজের প্রতি ছড়ানো বিদ্বেষ এর কারণ জানার আগ্রহ প্রকাশ করবে তখন কিন্তু কেঁচো খুঁজতে সাপ বেড়িয়ে আসবে। আর তখন স্বভাবতই তারা ধর্মের বিপক্ষে চলে যাবে। তাই ধর্মকে রক্ষা করতে হলে আপনার ধর্ম ও সমাজে সকলের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরী করুন। এটা বুঝতে পেরেই স্কটিশ চার্চ, পোপ ফ্যান্সিস, আল ফাতেহ ফাউন্ডেশন, ক্যানাডিয়ান মুসলিম কংগ্রেস, ব্রিটেনের মুসলিম স্কলাররা এবং ইদানিং ভারত ও নেপালের হিন্দুরা সমকামীদের প্রতি বিদ্বেষ ত্যাগ করে সমকামীদের ন্যায্য দাবিকে সামর্থন করা শুরু করেছে। পরিশেষে ধর্মীয় নেতাদের কাছে একটি বার্তা পৌছে দিচ্ছি “আপনারা আমাদেরকে ভালবাসবেন তো বিনিময়ে ভালবাসাই পাববেন, ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াবেন তো আমরাও আপনাদের মুখোশ উম্মোচন করে দেব”।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি