চেতনার আহবান
ইয়াছিন আরাফাত

১৬ জুন ২০১৮

রংপুরের ছেলে আমি। আবার একজন সমকামী। সমকামী বলতে অচ্ছুৎ কিছু না। সেই যে কতদিন আগে লেসবিয়ান (মেয়ে সমকামী) সানজিদা এবং তার সঙ্গি বাসা থেকে পালিয়ে গেল একটু স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য। কিন্তু তাদের এই স্বাধীনভাবে বাঁচার সংগ্রামকে আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো নানা রকম রূপ ও রস দিয়ে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিল একটা অচ্ছুৎ বিষয় হিসেবে। কিন্তু সেদিন অনেকের মনে তাদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হলেও আমার মনে কিন্তু তাদের জন্য ঘৃণার বদলে ভালবাসা সৃষ্টি হয়েছিল এবং নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক পরম আনন্দ সেদিন অনুভব করেছিলাম। সেই সাথে প্রচন্ড রাগও হয়েছিল আমাদের দেশের সংকীর্ণ সমাজ ব্যবস্থার প্রতি। তখন অবশ্য বয়সও আমার তেমন বেশি ছিল না - সবে মাত্র নবম শ্রেণিতে উঠেছিলাম। তখনকার সেই সময়ে আমার মানসপটে তৈরী হয় এই সংকীর্ণ সমাজের প্রতি এক বিদ্রোহ। শুরু হয় আমার পথচলা।

যে বয়সটাতে মানুষ যৌন কেন্দ্রীক ভাবনাকেই বেশি প্রধান্য দেয়, সেই বয়সেও চলতে থাকে আমার এক অঘোষিত সংগ্রাম। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছি গুটিকয়েক সমমনা বন্ধু। আজ আমি ইন্টার ২য় বর্ষের ছাত্র। তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট। তবে নিজের চিন্তাগুলা যে আকাশ ছোঁয়া এটা অনেকের মতো আমি নিজেও অনুভব করতে পারি। কিন্তু আমারই বা দোষ কি? সেই সময়ে মনের মধ্যে চেপে রাখা সংকীর্ণ সমাজের প্রতি বিদ্রোহী চেতনা আজ যেন আগ্নেয়গীরির লাভার মতো উপচে পড়ছে। তাই আর থেমে থাকতে পারিনি। ডাক দিয়েছিলাম একটা সমকামী সংগঠন প্রতিষ্ঠার জন্য। মনের বাসনা ছিল কাজ করবো গ্রাম্য সেই ছেলেটার জন্য, যার চালচলন একটু মেয়েলী বলে শুনতে হতো সেই চিরাচরিত গালিঃ "এই মাগী/মাইগ্যা"। অপমানে, সমাজের মানুষ নামক হায়েনাগুলোর নির্যাতনে সে কখনও হাসা তো দূরের কথা স্বাধীনভাবে কাঁদারও সুযোগ পায়নি। হ্যাঁ, আমি গ্রাম্য গাইয়া ছেলে, হয়ত তাদের দুঃখগুলো দূর করে দিতে পারবো না। কিন্তু তাদের চোখের দু’ফোঁটা জল মুছে দিয়ে বলতে তো পারবো: ''পাগল কাঁদিস কেন, আমি তো আছি"।

আসলে তারা আর তেমন কিছু চায় না। শুধু কষ্টের মাঝেও এই শান্তনাটুকু চায় - চায় একটু আশার আলো। আপনারা তো অনেকেই অনেক বড় ব্যক্তিত্ব, আপনারা তো চাইলেই সমকামী নামের চরম নির্যাতিত এই সম্প্রদায়ের প্রতি একটু হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়, সব ভুলে গিয়ে আমার হাতে হাত রেখে এই কাজে অংশ নিতে পারেন। যখনই আমি মনোবল হারিয়ে ফেলেছি তখনই রোকেয়ার আত্নজীবনী নিয়ে বসে পড়েছি। সে যদি পাঁচ সাত জন নারীকে নিয়ে নারীর মুক্তির জন্য নারীবাদী আন্দোলনে নামতে পারে, আমি কেন পারবো না। ঠিক এটাই ছিল আমার এই সংগ্রামের পথে দৃঢ় থাকার মূলমন্ত্র। হ্যাঁ, আমার এই কাজের ফলে হয়তো হায়েনাদের রক্তক্ষুধা বেড়ে যাবে। হয়ত চক্ষুশূল হয়ে উঠবো তাদের - হয়তো একসময় আমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিবে। কিন্তু তাতে কি আমি ভয় পাই? হাজার মানুষের জন্য মরাও যেন অমরত্ব। যেমন অমরত্ব পেয়েছে আমার মহান নেতা জুলহাজ এবং তনয়। মরেও যেন তারা বেঁচে আছে লক্ষ সমকামীদের অন্তরে। তাই তো আমার হৃদয় থেকে একটিই গান বাজে ''যদি এ পথ চলিতে কাটা বিধে পায়, হাসি মুখে সে বেদনা সইবো"।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি