পিঠা
মোঃ সুমন সিকদার

পথের ধারে একদিন বসে ভাবছিলাম অজানা কথার অর্থগুলো। হঠাৎ করে দেখলাম গঙ্গা নদীর ধারে কে জানি মনের সুখে গান গাইছে। গানটি আমার ভাল লাগলো। মন চাইলো লুকিয়ে সেই গানের অনুভুতিগুলো উপলদ্ধি করি এবং তাই করলাম। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে কে যেন তাকে ডাকলোঃ “অনি, তোর কাজ কি হল”? বুঝতে পারলাম তার নাম অনি। মনের সুখে গঙ্গার তীরে মাছ ধরছে আর গান গাইছে। তার নামটা মনের মাঝে গেঁথে নিলাম। কেন জানি মনে হতে লাগলো তার গান, তার সুর, তার তাকানো আমার খুব আপন। সে হাসলে মনে হত বিলের জল হাসে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম তার দিকে।

পড়াশোনা শেষে প্রতিদিন বিকেলে ঠিক গঙ্গার তীরে এসে হাজির হতাম তাকে দেখতে, তার গান শুনতে। ছেলেটা আমার থেকে বছর দু’এক বছর বড় হবে, কিন্তু তার হাসি ছিল পাগল করা। হয়তো বড় ঘরের ছেলে হলে আজ সুপার স্টার হত - অভাবের তাড়নায় আজ মাছ ধরছে। কি আর করবো? মন শুধু তাকে চায়। তো রোজ তাকে দেখতাম। একদিন আমিও গেলাম একটা ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে। ছেলেটা আমাকে দেখে বললঃ “কে ভাই আপনি, কখনো দেখিনি তো”? একটু ইতস্তিত হয়ে বললাম যে আমি সখের বসে মাছ ধরতে এসেছি - এ পাড়ায় নতুন। পড়াশোনার সুবিধার কারণে এখানে আসা। সে বললোঃ “তা আপনার নাম কি বাবু?” আমি বললামঃ “জীবন”। সে বললোঃ “সুন্দর নাম”।

আমিও তার সম্পর্কে জিজ্ঞেষ করলাম। সে বললো তার বাবা মা কেউ নেই। গত মহামারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ছোট ভাই আর একটা বোন আছে। সে তাদের পড়াশোনা করায়। তাদের সব আবদার পূরণ করতে পারে না। সে আরও বললোঃ “যাই হোক বাবু, আপনি এখানে কার বাসায় উঠেছেন”? আমি বললামঃ “আমার কোন আত্মীয় নাই এখানে - একটা ফ্লাটে উঠেছি আর কি”। সে জানতে চাইলো আমি কয়দিন আছি এখানে। জানালাম যে কয়দিন পর ফাইনাল পরীক্ষার পর চলে যাব। আমি বললামঃ “তুমি বিয়ে করনি”? সে কিছু বলে না, চুপ করে থাকে।

কিছুক্ষণ পর বললোঃ “আমার দ্বারা বিয়ে সম্ভব না”। বিকেল ফুরিয়ে এলো - বাসায় চলে এলাম আর ভাবলাম আমি কি তাকে বলে দিব যে আমি তাকে ভালোবাসি? পরে ভাবলাম না, সে যদি কিছু মনে করে? তাই আর বলা হল না। দু’দিন পরীক্ষার চাপে তাকে আর দেখতে যেতে পারিনি। তারপর যখন গেলাম, তখন দূর থেকে শুনলাম সে আস্তে আস্তে বলছেঃ “ওই বাবুকে এখন কেন দেখি না? সে কেন এখন আসেনা? বাবুকে আমার খুব ভাল লেগেছে।“ আবার বলছেঃ “দূর! কি যে বলি! সে কই আর আমি কই? আমার মত এই ছেলেকে কি সে পাত্তা দেবে”? আমার মনে হল যেন আমি আকাশের চাঁদটা পেয়েছি। বুঝতে পারলাম সে আমাকে পছন্দ করে।

কিছুক্ষণ পর গিয়ে বললামঃ “অনি ভাই ভাল আছেন”? সে বললোঃ “না বাবু”। আমি জানতে চেলাম কেন। সে বললো কিছুদিন যাবৎ তার দিনকাল ভাল যাচ্ছে না, মন ভাল না। আমি বুঝতে পারছিলাম কেন তার মন ভাল না। সে আমাকে জিজ্ঞেষ করলোঃ “বাবু আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন? দু’দিন দেখলাম না যে”? আমি তাকে না আসার কারণ বললাম। সে যেন এক দীর্ঘ নিঃস্বাস ছাড়লো - মনে হল কি যেন ফিরে পেয়েছে। যাই হোক, সে বললোঃ “জানেন? আমার সাথে সময় দেবার জন্য কেউ নাই”। আমি বললামঃ “কেন? তোমার কোন বন্ধু নাই”? সে বললোঃ “গরিবের আবার বন্ধু”! আমি বললামঃ “ওহ। তা তুমি আমার সাথে সময় কাটাতে পারও। আমি বেশির ভাগ সময়ই অবসর থাকি। তুমি আসলে জমিয়ে কথা বলা যাবে”। সে কিছুক্ষণ থেমে থেকে বললোঃ “সত্যিই বাবু”? তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসলাম আর বললামঃ “তোমার যখন ভাল লাগবে তখনই এসো”। সে চলে গেল আর যাবার আগে বললোঃ “বাবু, আপনি খুব ভাল”।

পরের দিন খুব ভোরে এসে সে হাজির। সে আমার দরজায় নক করছে আর বলছেঃ “বাবু কি এখনও ঘুমাচ্ছেন”? আমি দরজা খুললাম আর দেখলাম তার হাতে একটা বাটি। জানতে চেলাম সেটা কি। সে বললোঃ “পিঠা বাবু, আপনার জন্য আনলাম”। আমি বললামঃ “এগুলো কেন”? সে বললোঃ “একথা কেন বাবু? আমি কি আনতে পারি না? তাছাড়া এখানে আপনি একা - কি করছেন, কি খাচ্ছেন – আমাকে খাওয়াতে অসুবিধা হচ্ছে সেটা আমি জানি বাবু”। সে হেসে আরও বললোঃ “বাবু, আপনার জন্য নিজ হাতে পিঠা বানিয়েছি। আপনি খেয়ে নিন”। এখানে আমাকে দেখার মত তেমন কেউ ছিল না। তাকে পেয়ে খুব ভাল লাগলো। তাও বলতে পারলাম না যে আমি তাকে ভালোবাসি। যাই হোক, প্রতিদিন সকালে এসে সে হাজির হত - কখনও পিঠা, কখনও পায়েস আবার কখনও গুটি কয়েক পেয়ারা। একদিন বললোঃ “বাবু, একদিন এই গরিবের ঘরে আসবেন। আপনার জন্য মাদুর কিনে রেখেছি বসতে দিব বলে। যাবেন তো”? আমি বললামঃ “হুম, যাব”।

কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারনে তার বাসায় আর যাওয়া হল না। একদিন সকালে সে আর আসলো না। দু’দিন কেটে গেল তাও তার কোন খবর নেই। আমি চললাম তার খোঁজে। তার বাসায় গিয়ে দেখি সে অসুস্থ। আমাকে দেখে সে হুরমুর করে উঠে বসতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। আমাকে বললোঃ “বাবু আজ আসলেন”? ছোট ভাইকে বললো মাদুরটা পেতে দিতে। আমি বসলাম আর সে করুণার সুরে বলতে লাগলোঃ “বাবু, আমি মনে হয় বাঁচবো না। আমার মত ছেলেকে আপনি এতটা সময় দিয়েছেন যে আমি ভুলতে পারবো না। আমি মরে গেলে ক্ষমা করে দিয়েন”। আরও বললোঃ “বাবু, আমি মরে গেলে আমার কাফনের কাপড় আপনি কিনে দিয়েন”। “ছিঃ! এমন কথা বলতে নেই” – আমি বললাম। “তোমার কিছু হবে না”। আসার সময় তার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দিয়ে আসলাম তার ভাইয়ের কাছে। মনের মাঝে কেন যেন হাহাকারের সুর বাজতে লাগলো। তার পরের দিনই বাড়ি থেকে চিঠি আসলো যে মা অসুস্থ। তাই বাড়িতে চলে গেলাম।

বাড়ি থেকে দু’দিন পর আবার ঢাকা চলে এলাম। এসেই তার বাড়িতে যাবার জন্য রওনা হলাম। কিন্তু যাবার পথে তার ভাইয়ের সাথে দেখা। সে বললোঃ “আপনি আজই আসলেন? কাল রাতেই ভাই মারা গেছে। আপনার বড্ড নাম করেছে”। সাথে সাথে মনে হল আমার পৃথিবী যেন শেষ হয়ে গিয়েছে। চোখের জল যেন শুকিয়ে গিয়েছে। চারিদিকে যেন হাহাকার আর নিস্তব্ধতা। মনে হল সে বলে ছিল তার কাফনের কাপড় আমাকে কিনে দেবার কথা। তার ভাইয়ের কাছে টাকা দিলাম তার কাফনের কাপড় আনার জন্য। এলাকার কবরস্থানেই তার দাফন করা হবে। কবর খোড়া হল। তাকে মাটিতে শুয়ে দেয়া হল। সবার সাথে আমিও দু’মুঠো মাটি দিলাম। সাথে সাথে মনে হল, ও বেচে থাকলে বলে উঠতোঃ “কেমন আছেন বাবু? পিঠা খাবেন”?





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি