একটি অপহরণ
মোঃ সুমন সিকদার



কলেজ থেকে আসার পথে একদল দুষ্কৃতকারী আমাকে অপহরণ করে। আমাকে জঙ্গলে এক বাঙ্গলো বাড়িতে আটকে রাখে। ঐ জায়গাটার নাম কি মনে নেই। আমাকে পাহারা দেবার জন্য তিন জন লোক রাখা হয়। এর মধ্যে একটা ছেলেকে আমাকে অত্যাচার করা আর দেখার জন্য রাখা হয়। ছেলেটা আমার বয়সই ছিলো। কিন্তু আজব কথা হলো যে সব সময় ছেলেটা ভেতরে আসতো ঠিকই, কিন্তু আমাকে কোনও অত্যাচার বা আঘাত করতো না। খুব মন মরা হয়ে থাকতো। আমার হাত-পা বাধা ছিলো। আমার কেন জানি মনে হল ও এদের মত এতোটা খারাপ না।

আমি ওকে আমার বাধনটা খুলে দিতে বললাম। ও খুলে দিলো - আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলামঃ “ভাইয়া আমি কি আপনার সাথে কথা বলতে পারি”? তিনি দ্বিধাবোধ না করেই বললোঃ “বল”। আমি বললামঃ “আপনার কি হইছে? আপনার কি মন খারাপ”? সে বললোঃ “তুমি শুনে কি করবে? তাছাড়া তোমার মুক্তিপনের টাকা না আসলে তোমাকে বাচিয়ে নাও রাখতে পারে”। আমি বললামঃ “যদি আমার মরণ থাকে তাহলে মরবো। তবে মানুষের জীবন নিয়ে কি লাভ পান ভাইয়া? তাছাড়া আমি তো আপনাদের কোনও ক্ষতি করিনি - আমাকে কেন আটকিয়ে রেখেছেন”?

ছেলেটি কথা বলে না। আমি বললামঃ “ভাইয়া, আপনার কি হয়েছে জানতে পারি”? ছেলেটি বললোঃ “শুনবে আমার জীবনের মর্মান্তিক কাহিনী”? আমি বললামঃ “হ্যা”। সে বলতে শুরু করলো। ও তখন খুব ছোট - ওর মা মারা যায় আর কিছুদিন পর ওর বাবা আরেকটা বিয়ে করে। সব ভালই চলছিল – ও স্কুলে পড়তো। যখন সে ৮ম শ্রেনিতে পড়ে তখন ওর বাবা দূর্ঘটনার কারণে পঙ্গু হয়ে যায়। তারপর থেকেই ওর সৎ মা তার ওপর নির্যাতন শুরু করে। এক পর্যায়ে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

ছেলেটা ঢাকায় চলে আসে। অনেক খোঁজা খুঁজির পরও কোনও কাজ পায় নি। হঠাৎ করে কালাম নামের এক বড় ভাইয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। কালাম তাকে ঢাকার বাইরে নিয়ে যায় চাকরি দিবে বলে। সেখানে গিয়ে সে একটা গুন্ডাদের দলের নেতার সাথে পরিচিত হয় কিন্তু বুঝতে পারেনি তাকে আসলে কি কাজ করতে হবে। যখন ও জানতে পারলো তখন সে চলে যেতে চায়। কিন্তু তারা তাকে জীবনের ভয় দেখিয়ে এই দল থেকে আর বের হতে দেয় নি। ছেলেটি বলতে বলতে কেঁদে ফেলে। আমারও চোখে জল এসে পড়ে। এর মধ্যেই বাইরে থেকে একজন ওকে ডাকলে ও বাইরে চলে যায়।

আমি ভেতরে বসে ভাবতে থাকি তার কথা। কিছুক্ষণ পর সে আবার আসে। আমার ছেলেটাকে ভালো লেগে যায়। আমি বললামঃ “আর বন্দী থাকতে ভালো লাগে না - আমাকে তো মেরেই ফেলবেন। একটা কথা রাখবেন? আমাকে একটু আশ-পাশটা ঘুরাবেন”? ছেলেটা কিছু বলে না। কিছুক্ষণ পর বলেঃ “আচ্ছা”। আমাকে নিয়ে ও বের হলে দেখি বিশাল জঙ্গল - কাউকে দেখা যায় না। আমি ছেলেটাকে বললামঃ “আচ্ছা ভাইয়া, আপনি কখনও এখান থেকে বের হতে চান নি”? ও বলে যে সে পারে নি। আমি ভয়ে বলতে লাগলাম যে আমি তাকে অনেক পছন্দ করে ফেলেছি। ছেলেটি একটু হাসলো আর পালবার ফন্দি বের করতে লাগলো।

আমি বললামঃ “আপনি কি চান না, নতুন করে ভালো পথে জীবন চালাতে”? ও বললোঃ “হ্যা”। আমি ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বললাম যে আমি তাকে ভালবেসে ফেলেছি। ও কিছু না বলে চোখ মুছলো। কিছুক্ষণ পর বললো তুমি পাগল নাকি? আমি বললামঃ “না, সত্যি”। ও হতবাক হয়ে রইলো। কিছুক্ষন পর আমাকে জড়িয়ে ধরে বললোঃ “সত্যি আমাকে পরিবর্তন করে একটা সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারবে”? আমি বললামঃ “হুম”। তারপর দুই দিন বন্দী ঘরে কেটে গেলো। ছেলেটা আসলোই না কিন্তু হঠাৎ তৃতীয় দিন আসলো আর আমাকে বললো আজ বস বাঙ্গলোতে নেই, তাই আজ পালাতে হবে।

ছেলেটা আমাকে নিয়ে পিছন দিক দিয়ে জঙ্গল পেড়িয়ে পালায় - আমিও ওর সাথে জঙ্গল থেকে পালিয়ে এক বাসে চেপে বসি। তারপর বললামঃ “আমরা কই যাব”? সে বললোঃ “জানি না - এখন তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই”। আমি ওকে বাড়িতে নিয়ে আসলাম। সেলুনে নিয়ে গিয়ে শেভ করালাম। নাম পরিবর্তন করে রাখলাম দিপু থেকে সায়মন। তাকে বড় ভাইয়ের দোকানে কাজে লাগালাম আর বললামঃ “কখনও না বলে বাইরে যেও না, এতে তোমার বিপদ হতে পারে”। ও আমাকে জড়িয়ে ধরে আমাকে একটা চুমু দিল। ঠিক তখনই আমার ঘুম ভেঙে গেলো। জীবনটা শুরু করেও করতে পারলাম না।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি