বিলেতি সাম্রাজ্যবাদের সমকামভীত নিদর্শনকে ভারত অবশেষে মুছে ফেলতে যাচ্ছে
ইবতিসাম আহমেদ

ইবতিসাম আহমেদ বিলেতি সাম্রাজ্যবাদের ফলে উপনিবেশগুলোতে সমকামভীতির আইনি ও সামাজিক আবির্ভাবের উপর গবেষনা করেছেন এবং তার পিএইচডির একটি অংশ হিসেবে নিচের লেখাটা প্রকাশ করেছেন কিছু মাধ্যমে। তার অনুমতি নিয়ে এখানে তার ইংরেজী লেখাটার বাংলা অনুবাদ দেয়া হল। আর ইংরেজী লেখাটার যোগটা এখনই দেয়া হল।

The British Empire's Homophobic Legacy Could Finally Be Overturned In India
--------------------------------------------------

একটি যুগান্তকারী রায়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সেই দেশটির সংবিধান অনুযায়ী যে কোন ব্যক্তির গোপনতা নিশ্চিত করেছে – এই গোপনীয়তা যৌন প্রবৃত্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আগষ্ট মাসের ২৪ তারিখে দেয়া এই রায় দেশটির যৌন সংখ্যালঘুদের মনে আশা যুগিয়েছে, যারা এখনও ইংরেজ আমলের একটি সমকামভীত নিদর্শন, যা সমলিঙ্গীয় সম্পর্কগুলোকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, তা দ্বারা মানবতর জীবন যাপন করে। একটি দন্ডবিধি যা ৩৭৭ ধারা হিসেবে পরিচিত, তার উপর একটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো বাকি আছে এবং আদালত এই বিষাক্ত ঔপনিবেশিক নজিরটিকে বাতিল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই ধারাটির সুত্র খুঁজে পেতে হলে আমাদেরকে ১৫৭ বছর আগে বিলেতি সাম্রাজ্যবাদের একটি অন্ধকার যুগে চলে যেতে হবে। ১৮৬০ সালে বৃহত্তর ভারত তিন বছর হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ১৮৫৭ সালে সেপাই বিদ্রোহের পর বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কম্পানী বিলেতের রানীর হাতে ভারতের নিয়ন্ত্রন তুলে দেয় এবং সেই দখলটিকে এই বলে ন্যায্য বলে দাবী করে যে উপনিবেশগুলোতে “সভ্যতা” আনার প্রয়োজন। এই সভ্যতা আনার প্রয়াসের সঙ্গে ছিল বাসনা এবং ভালবাসাকে সেখানে যেভাবে প্রকাশ করা হত তার সংস্কার করার প্রচেষ্টা।

সেই সময়ে ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক রীতি ছিল – যা ধর্ম, নির্দিষ্ট জায়গা এবং কোন কোন সময়ে মানুষের বর্ণ দ্বারাও প্রভাবিত হত। যে কোন বিষয়ের উপর যে সবখানে একটা ঐকিক মতবাদ বা ধারনা ছিল – এটা দাবী করা ভুল। বিপরীতে দেখা গেছে যে মানুষের যৌনতাকে প্রাচুর্যে ভরা বিভিন্ন রূপে অনুধাবন করা হত। এমনকি রক্ষণশীল এলাকাগুলোতেও সমলিঙ্গীয় অন্তরঙ্গতা ছিল স্বাভাবিক জীবনের অংশ।

আওয়াধ, যা বর্তমান যুগে ভারতের লখনো অবস্থিত, সেখানকার এককালিন শাসক মাঝে মধ্যে তার বিপরীত লিঙ্গের বেশ ধরে চলতেন এবং যৌন সঙ্গী পালটাতেন। ১৯শ শতাব্দীর শেষ দিকের বাংলা উপন্যাস সমূহ – যার একটি উদাহরন ইন্দিরা – সেগুলোতে মেয়ে সমকামী সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছে। কামসুত্রে পরষ্পর সন্মত সমলিঙ্গীয় যৌনাচারেরও অনুশাসন দেয়া আছে। এবং পূর্ব ভারতে সুফিদের পাঠ্যলীপিতে পুরুষ সমকামীদের প্রেম কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।

ইংরেজদের চোখে একটি সমাজের রূপ কি হওয়া উচিৎ তার সাথে এইসব রীতি রেওয়াজ খাপ খায়নি। রানী ভিক্টোরীয়া দ্বারা গঠিত একটি খৃষ্টিয় নৈতিক মূল্যবোধের নীতিমালা যে সকল অন্তরঙ্গতা শিশু ধারন, জন্ম এবং লালন পালনের জন্য নিবেদিত হয় না, সে সকলকে অগ্রহনযোগ্য বলে ঘোষনা দিয়ে দেয়। সমকামিতাকে এইসব বাসনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ বানিয়ে দেয়া হয়।

এরকম একটি অনমনীয় দৃষ্টি দিয়ে বিলেতিদের সামাজ্র ৩৭৭ ধারা নামের একটি দন্ডবিধি সমস্ত ভারতে জারী করে দেয়। এই আইনটি যে কোন “অগ্রহনীয় যৌনাচার”-এ লিপ্ত হওয়াকে অপরাধ সুচক বানিয়ে দেয়। দোষীদের উপর কারাদন্ড, জরিমানা অথবা দুইটাই আরপ করার বিধান দেয়া হয়। এই আইনটি পরে অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া এবং আফরিকা মহাদেশের বিভিন্ন উপনিবেশগুলোতেও ছড়িয়ে দেয়া হয়।

ঐক্য বিহীন বিরোধীতা

ঐতিহাসিকভাবে ৩৭৭ ধারা সমকামীদেরকে এককভাবে লক্ষ্য করেনি। এটা প্রচার করা হয়েছিল সন্তান জন্ম দেয় না এমন কোন যৌনাচারকে বিরত রাখার জন্য। অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে বিষমকামীদের মধ্যে নিরাপদ যৌনসঙ্গম এবং কোন প্রকার জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতিও এই ধারার মাধ্যমে বে-আইনি হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো তদারকির মধ্যে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং সময়ের সাথে সাথে এই ধারাটি সমকামের উপরেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ফেলে।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন যৌনতার রূপ এই দৃষ্টি আকর্ষনের বিরুদ্ধে দূর্বলতার প্রতিক হয়ে দাঁড়ায়। সমকামিতা নিয়ে একটি ঐক্য ভিত্তিক চিন্তার অভাবে ভারতে ১৮৬০ সালে ৩৭৭ ধারার জোরপুর্বক জারিকরনের বিরুদ্ধে কোন একক কন্ঠস্বর গড়ে ওঠেনি। এর সাথে যুক্ত হয় একটি শক্তিশালী প্রচারণার যন্ত্র যা বিলেতিদের সামরিক সাফল্যকে খাটি পুরুষত্বের সাথে তুলনা করে এবং স্থানীয়দের বশীকরনকে তুলনা করে পুরুষদের মাঝে স্ত্রীস্বভাবের সাথে। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালে সামরিক অভিযান এবং তারও আগে বাংলায় পলাসির জয় নিয়ে ঐতিহাসিক পান্ডুলীপি ভারতের মেয়েলি পুরুষদের নিম্নতা ব্যাক্ত করে।

তার উপর নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যেমন হিজড়া – যারা ছেলে বা উভলিঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহন করে কিন্তু নারীদের পোষাকে নিজেদের উপস্থাপনা করে – তাদের সামাজিক স্তর ও ক্ষমতা নিম্নতর করার একটা সুদৃঢ় এবং সফল প্রয়াস শুরু হয়। বলতে হবে যে আজকে হিজড়ারা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে আইনের দিক থেকে রক্ষিত।

এই ভাবে ঔপনিবেশকালে সমগ্র উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠাপিত হয় বিধিসিদ্ধ সমকামভীতি (এবং এর সাথে নারী-বিদ্বেষ এবং বৃহত্তর যৌন সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য)। ২০শ শতাব্দীতে উপমহাদেশের স্বাধীনতার হাওয়া বইতে শুরু হওয়ার পর ৩৭৭ ধারার প্রতি কোন প্রকার চ্যালেঞ্জ মুখ থুবরে পড়ে এবং যৌন সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতার কোন চেষ্টার খবর আর কোথাও পাওয়া যায়নি।

সমকামভীত আইন রেখে দেয়া হয়

পাকিস্তান এবং ভারত আলাদা দেশ হয়ে জন্মগ্রহন করার পর নতুন সংবিধান এবং দন্ডবিধি তৈরি করে কিন্তু অনেক ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রন রয়ে যায়। তাদের খাতায় ৩৭৭ ধারাটি রেখে দেয়া হয়। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে তখন সেখানেও এটা বজায়ে রাখা হয়। আমাদের অঞ্চলের সাম্রাজ্যবাদের তিনটা দেশেই – ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ – এই দন্ডবিধি এখনও কার্যকর।

আদতে বর্তমান দুনিয়ার যেই ৭২টি দেশে সমকামিতা আজকে অবৈধ, তাদের মধ্যে ৩৬টা দেশেই তা হয়েছে ৩৭৭ ধারার মত আইনের ফলে। এই বিষাক্ত পরিণামের ফলে আজ ৫২টি দেশ সন্মিলিত কমনওয়েলথ পৃথিবীর সবচেয়ে সমকামভীত একটি সংঘটন।

২০১৭ সালে বিলেতি ইতিহাসের দুইটা মাইলফলক উৎযাপন করা হচ্ছে। এক হচ্ছে ১৯৬৭ সালের যৌন অপরাধ বিলের ৫০তম বার্ষিকি যা বৃটেনে পরষ্পর সন্মত দুই প্রাপ্তবয়ষ্ক সমকামীদের মধ্যে যৌনাচার আংশিকভাবে অনরপরাধ হিসেবে স্থাপন করে – এবং দুই হচ্ছে বিভাজনের ফলে ভারত এবং পাকিস্তানের আবির্ভাব, যা উপমহাদেশে বিলেতি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটায়। দুইটা বার্ষিকিই উৎযাপন করা হচ্ছে প্রগতি এবং সমতার জয় হিসেবে।

যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান এবং ভারতের এই দীর্ঘ যাত্রা উৎযাপন করা অবশ্যই কাম্য। কিন্তু এটাও আবশ্যক যে প্রান্তিক কন্ঠগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। ঔপনিবেশিতাকে ইতিহাসের পাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে চাইলে তার সবকটা নিদর্শনগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলতে হবে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত আজ সেই কাজটিই করতে যাচ্ছে মনে হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে একটি দরখাস্ত করার আয়োজন চলছে, তবে এই নিয়ে কোন অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি – এবং পাকিস্তানে কোন মামলার সংবাদ নেই কারো জানা মতে। এর প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত আসলেই নেই কোন স্বাধীনতা।

সম্পাদকের মন্তব্যঃ

স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের মত দেশে ধর্মের দোহাই দিয়ে ৩৭৭ ধারা বাতিল করার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়। তো এখানে বলতেই হবে যে কোরান শরীফে সমকামিতার কোন বিশেষ শাস্তির কথা উল্লেখ নেই। লুতের কাহিনী বর্ণিত আছে কিন্তু সেই শহর পরষ্পর সন্মত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সমকামিতার জন্য ধ্বংস করা হয়েছিল না কি পুরুষ ধর্ষনের জন্য করা হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে সমকামিতার জন্য শাস্তির বিধান পাওয়া যায় হাদিসে, যা নবীর মৃত্যুর দুইশত বছর পর সংকলিত করা হয়। এতে তার অকৃত্রিমতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থাকে। এর পর সমকামিতার শাস্তি একেক সময়ের একেক মুসলমান সমাজ একেক ভাবে নির্ধারন করেছে (যার সব চেয়ে জঘন্নতম নমূনা আমরা সম্প্রতি দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক স্টেটে যেখানে সমকামীদেরকে ধরে ধরে উচু দালান থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে)। কিন্তু তার কোনটিও তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের দন্ডবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, করতে দেয়াও যাবে না কোন দিন। বর্তমান দন্ডবিধি অনুযায়ী সমকামিতার জন্য দশ বছর কারাদন্ড এবং/অথবা জরিমানার ব্যাবস্থা রয়েছে। কিন্তু এটার পরিণাম হচ্ছে যে সমকামীরা জন্মগত ভাবেই অপরাধী এবং ধর্মিও মৌলবাদী অথবা পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব দ্বারা কেউ হুমকির মুখে পড়লে পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে কেউ নিরাপত্তা চেতে পারে না।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি