অর্থনীতির জন্য সমলৈঙ্গিক বিবাহ কেন ইতিবাচক
ফাব্রীজিও কারমিঞানী



অর্থবিদ্যা সমলৈঙ্গিক বিয়ে নিয়ে কি বলে

ভালবাসা আর সঙ্গ মানুষকে সুখী করে এবং যুগলরা সাধারণত এই দুই কারণেই বিয়ে করে। অর্থনীতিবীদদের মতে ভালবাসা আর সঙ্গ এক প্রকার পণ্যঃ এগুলো বাজারে কেনা বা বেচা যায় না, কিন্তু এগুলো একটি গৃহের সদস্যদের সুখের জন্য উৎপাদন করা যায়। এসব গৃহ-উৎপাদিত পণ্যগুলোর মধ্যে আরও কিছু সম্ভাব্য জিনিষ আছে যেমন বাচ্চা লালন করা, রান্না করা, এক জন আরেক জনের যত্ন নেয়া, এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই পণ্যগুলো কিভাবে আরও দক্ষতার সাথে তৈরি করা যায় যাতে মানুষ আরও সুখী হতে পারে।

দক্ষতা বলতে এখানে শুধু অধিক বলে বোঝানো হচ্ছে না। এখানে বোঝানো হচ্ছে আরও উন্নত মানের সামগ্রী। যেমন, কয়বার রান্না করা হয়েছে এবং তা সাবার করা হয়েছে, শুধু তা দিয়ে একটা মানুষের সুখ বিচার করা যাবে না – রান্নার গুনগত মানের উপরেও তা নির্ভরশীল। অর্থনীতিবীদরা বিবাহকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেন। একটা বিয়ে কি কি পণ্য তৈরি করতে পারে তা পর্যবেক্ষণ করে আমরা বুঝতে পারি মানুষ কেন বিয়ে করে, কিভাবে তারা বিবাহিত যুগল হিসেবে নিজেদের গুছিয়ে নেয়, এবং বৃহত্তর সমাজের জন্য এর অর্থ কি দাঁড়ায়। দেখা যাচ্ছে যে অর্থনীতি বিদ্যা একটা বিবাহিত জীবনের কিছু ব্যবহারিক বৈশিষ্ট সুন্দর ভাবে বিশ্লেষণ এবং গণনা করতে পারে যা আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক মনে হতে পারে। যেমন আমরা অনুধাবণ পারি বিবাহিত আর অবিবাহিত মানুষদের মধ্যে অর্থ উপার্জনের ইচ্ছা এবং তার জন্য তারা কি পরিমান কাজ করতে ইচ্ছুক তার মধ্যে পার্থক্যটা।

আমরা বিয়ে করি কারণ......

বিবাহের মূল অর্থনৈতিক চিন্তাধারা আসে নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত গ্যারি বেকারের তত্ত্ব থেকে। মানুষ বিয়ে না করেই ঘরের পণ্য কিছু পরিমানে তৈরি করতে পারে। কিন্তু, যখন তারা বিয়ে করে, তখন তাদের সম্পদ দ্বৈতও ভাবে একত্রিত করতে পারে (যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সময়) এবং কিছু কিছু বিশেষ কাজে মনোযোগও দিতে পারে। যার ফলে তারা ঘরের জন্য আরও উন্নতমানের এবং অধিকতর সামগ্রী প্রস্তুত করতে পারে। যেমন, একজন কেনাকাটা করে এবং আরেকজন ঘর পরিষ্কার করে একটি বিবাহিত যুগল আরও ভাল খাদ্য তৈরি করতে পারে তাদের তুলনায়, যারা আলাদা ভাবে কেনাকাটা, ঘর পরিষ্কার এবং রান্না-বান্না করে। তাত্বিকভাবে, একই সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাস করলেও এই উৎপাদনশীলতা লাভ করা যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দুইজনকে গুরূত্বপূর্ন বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হতে হয়, যেমন গৃহস্থালীর আর্থিক ব্যাপার স্যাপার, উত্তরাধিকারপ্রাপ্তি এবং অন্যান্য জিনিষ।

এই সব ব্যাপারগুলো নির্ণয় করতে যথেষ্ট অর্থ এবং সময় দু’টোই ব্যয় হয়, কিন্তু বিবাহের চুক্তিতে এগুলোর অনেক কিছুই আপনা আপনি নির্ধারিত হয়ে যায়। এবং এতেই সম্পর্ক নিয়ে বাস করার চেয়ে বিবাহিত জীবনে ফলপ্রদতা বাড়ে। তাই মানুষ যদি উপরে উল্লেখিত পণ্যঃ ভালবাসা, সঙ্গ, একত্রে বাড়ীর কাজ সারা ইত্যাদি পেতে চায়, তাহলে তারা তা বিয়ের মাধ্যমেই অর্জন করলে লাভ বেশি, যদি সেই বিবাহের অনুমোদন থাকে। এই পুরো কাঠামোটার জন্য যে মানুষদেরকে বিপরীত লিঙ্গেরই হতে হবে তা কিন্তু নয়। বিষমকামী এবং সমকামী যুগলরা কিছু আলাদা আলাদা পণ্য উৎপাদন করে ঠিকই, কিন্তু বিবাহের কারণে সেখানে একই ভাবে কিছু উৎপাদনশীলতা এবং ফলপ্রদতা পাওয়া যায়, লিঙ্গ যাই থাকুক না কেনো।

বাকি সমাজের উপর এর প্রভাব নিয়ে অর্থনীতি কি বলে?

অর্থনৈতিক দিক থেকে সমলৈঙ্গিক বিয়ের ফলে কিছু উৎপাদনশীলতা এবং ফলপ্রদতা (যেটাকে অনেকে সুখ ও শান্তি হিসেবে দেখে), বাড়ছে বলেই তা আইনিভাবে বৈধ করে ফেলতে হবে, তা আপনা আপনি বলা যাচ্ছে না – বিশেষ করে যদি এই বিবাহগুলোর ফলে সমাজের উপর কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর প্রেক্ষিতে আলোচনা হয় সমলৈঙ্গিক বিয়ে সমাজে মোট বিবাহ বন্ধনের সংখ্যা কমিয়ে দেবে কি না, বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে কি না, সন্তান জন্ম দেয়ার গুরূত্ব কমিয়ে দেবে কি না, সেগুলো নিয়ে।

আদতে এখন সমলৈঙ্গিক বিবাহ অনুমোদন করার ফলে সর্বজনিন বিবাহ, গর্ভপাত, বিচ্ছেদের হার এবং যুগলদের স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব নিয়ে অর্থনীতি, জনসংখ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও জনগনের নীতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশিত প্রয়োগিক গবেষনা বের হয়েছে। মার্কিন তথ্যাদি নিয়ে ২০০৯ সালের একটি গবেষনায় সমকামীদের বিয়ের ফলে কোথাও কোন ক্ষতিকর প্রভাব পাওয়া যায় নি। ২০১৪ সালের আরেকটি মার্কিন গবেষণায় সমকামীদের বিয়ের ফলে বিপরীত লিঙ্গের বিয়ে কমে যাওয়ার কোন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। আরেকটা গবেষণা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে সমকামী যুগলরা বিষমকামী যুগলদের মতই স্থিতিশীলতা অনুভব করে।

তবে এই ধরনের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য এখনও প্রারম্ভিক এবং সেটাকে তাই একটু সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে। এর কারণ হচ্ছে সমলৈঙ্গিক বিবাহ, যেখানে বৈধ, সেখানে কেবল ইদানীং প্রবর্তিত হয়েছে। তাই সেটার প্রভাব পর্যবেক্ষন করার জন্য বেশী দিন পার হয়নি এখনও। তবে ইতিমধ্যে প্রাপ্ত তথ্য থেকে সমলৈঙ্গিক বিয়ের কারণে সমাজের উপর কোন নেতিবাচক প্রভাবের হদিস পাওয়া যায় নি, এই কথা বলা যায়। সামনের দিকে তাকিয়ে বলা যায় যে আরও তথ্য সংগ্রহ হবার পর প্রয়োগিক গবেষণার মাধ্যমে আমরা আরও নিখুঁতভাবে সমলৈঙ্গিক বিবাহের বৈধতা চিরাচরিত বিয়ের সামাজিক উদ্দেশ্যকে দূর্বল করে দেবে কি দেবে না, তা নির্ধারণ করতে পারবো।

gayety





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি