যত প্রেম, তত জ্বালা
অ্যালেক্স শান্ত বৈরাগী



এক

মেঘনা নদীর পারে একটি গ্রাম। গ্রামটির নাম মধুপুর। এই গ্রামের মানুষ গুলো অত্যন্ত সহজ সরল। গ্রামের অধিকাংশ মানুষেই কৃষি নির্ভরশীল, তাই গ্রামে দুই চারটা উচ্চ শিক্ষিত মানুষ খুঁজে বের করা বড় কষ্টকর। গ্রাম জুড়ে রয়েছে বিশাল বিশাল ফসলাদী জমী ও আম, কাঠাল, কলা, জাম ও লিচু সহ নানান সব ফল গাছের বাগান। গ্রামের অধিকাংশ মানুষেরই পেশা কৃষি কাজ। আর এই গরীব কৃষকরা মাটির ও বাশের তৈরি ঘর বাড়িতে বসবাস করেন। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কীর্তিনাশা নদী - তাই ঐ গ্রামে মাঝি ও জেলেরা ও বসবাস করেন। কীর্তিনাশা নদীর পানি দিয়েই চলে গ্রামের মানুষের জীবন। যখন গ্রামের ছোট ছোট শিশু কিশোররা সাড়ি বেধে নদীতে গোসল করে সাতার কাটে ও গ্রাম বধুরা নদী থেকে পানি নিয়ে কলসি কাখে গ্রামের পথ ধরে হেটে যায়, এসব দৃশ্যগুলো মনমুগ্ধকর এক রূপ দেয়।

কীর্তিনাশা নদীর পাশে রয়েছে অনেক পুরানো একটি মাজার এবং মাজারের পিছনেই রয়েছে বিশাল এক বটগাছ। আর এই বটগাছকে ঘিরে রয়েছে অনেক জ্বিন ভূতের কল্পকাহিনী। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পর ঐ বটগাছের পাশ দিয়ে একা হেটে যেতে ভয় পায় কারন তাদের বিশ্বাস সন্ধ্যার পরেই বট গাছে জ্বিন-ভূতের আনাগোনা শুরু হয়। এমন কি গ্রামের অনেক মেয়ে ও বউদেরকে মাঝে মাঝেই জ্বিন-ভূতে ভর করে ঐ গাছ থেকে। সারা গ্রাম জুড়ে রয়েছে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের নেই কোন ইটের তৈরি ভবন। ভাঙ্গাচুরা একটি টিনের ভবন রয়েছে তাতে কয়েকটি ছোট ছোট কক্ষ রয়েছে। এখানেই গ্রামের কয়েক শতাধিক শিশুদের লেখাপড়ার কার্যক্রম চলে। বর্ষায় বৃষ্টির পানি টিনের চালা দিয়ে গড়িয়ে পড়ে এবং ভিজে যায় শিক্ষার্থীরা, ভিজে যায় তাদের বই খাতা।

এই বিদ্যালয়েরই তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র তৌসিপ। বয়স তার ৮ বছর। খুব মায়াবী ও নম্র প্রকৃতির ছেলে তৌসিপ - তার বাবা গ্রামের ডাকঘরের ডাকমাষ্টার। তৌসিপ তার বাবা মায়ের একমাত্র আদরের ছেলে। এছাড়াও তার আরও দু’টি বোন রয়েছে। বোনেরা তার বড় এবং তাদের বিয়ে হয়েছে শহরে। তৌসিপ একজন মেধাবী ছাত্র। তাই বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে অনেক আদর করেন, অনেক ভালোবাসেন। তৌসিপ সব সময় শ্রেনীকক্ষে সবার আগে প্রবেশ করে এবং বেঞ্চের প্রথম সারির প্রথম বেঞ্চে বসে এবং এই বেঞ্চটাতে আর কেউ বসতে পারে না কারন তৌসিপের আগে কেউ বিদ্যালয়েই আসতেই পারে না।

একদিন সকালে অসুস্থতার কারনে তার বিদ্যালয়ে আসতে দেরি হয়ে যায় আর তার প্রিয় বেঞ্চে বসে পড়ে অন্য একটি ছেলে। তার নাম রানা। তৌসিপ বিদ্যালয়ে এসে যখন দেখে তার বেঞ্চে রানা বসে আছে, তখন তৌসিপ রানাকে বেঞ্চ ছেড়ে যেতে বলে। রানা যখন তার কথা শুনে না তখন তৌসিপ রেগে যায় এবং দুজনের মধ্যে তুমুল মারামারি শুরু হয়। তারপর শ্রেনীতে শিক্ষক এসে রানাকে সরিয়ে দিয়ে তৌসিপকে তার বেঞ্চে বসতে দেয় কারন তৌসিপ মেধাবী ছাত্র - শিক্ষকদের ঠিকভাবে পড়া দেয়। সেই থেকে রানা তৌসিপের সবচেয়ে বড় শত্রু - ওরা দু’জন দু’জন কে দেখতেই পারে না।রানা গ্রামের বখাটে ছেলেদের সাথে চলাফেরা করে এবং যখন তৌসিপকে রানা রাস্তায় একা পায় তখনই নানান কটু কথা বলে। তবে তৌসিপ তেমন কোনো বাড়াবাড়ি করে না কারন তাতে ঝগড়া হবে।

তৌসিপ অনেক শান্ত শিষ্ট একটি ছেলে - মারামারি, ঝগড়াঝাটি তার ভালোলাগে না। সে একাকই থাকতে পছন্দ করে - তাই গ্রামে তার তেমন কোন বন্ধুও নেই। তবে গ্রামবাসীরা ছোট বড় সবাই তাকে অনেক ভালোবাসে কারন তৌসিপের ব্যবহার খুবই সুন্দর। একদিন তৌসিপ বিদ্যালয়ের পুকুরের পারে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পানিতে তার প্রতিচ্ছবি দেখে নিজের ছবি অংকন করছে। এরই মাঝে রানা তৌসিপকে দেখতে পায় আর রানার মনে দুষ্ট বুদ্ধির উদ্ভব হয়। রানা আস্তে গিয়ে তৌসিপের পিছনে দাঁড়ায় এবং তাকে ধাক্কা মেরে পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। তৌসিপ পানিতে পড়ে আতঙ্কিত হয়ে যায়। তৌসিপের জামা-কাপড় সব কিছু ভিজে যায়। তৌসিপ পেছন ফিরে দেখে রানা তাকে ফেলে দিয়ে জোরে জোরে হাসছে। তৌসিপ পানি থেকে উপরে উঠে আসে এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বিচার দেন, আর রানা দৌড়ে পালিয়ে যায়।

তৌসিপ আর রানা দুজনেই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেনী পাশ করে চতুর্থ শ্রেনীতে উঠেছে কিন্তু তাদের মধ্যে শত্রুতা থেকেই যায়। একদিন বিদ্যালয়ের টিফিনের বিরতির সময় তৌসিপ টিফিন কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখে কেউ একজন অসুস্থ হয়ে বেঞ্চের উপর শুয়ে শুয়ে কাঁদছে আর তার শরীরটা কাপছে। তৌসিপ দৌড়ে তার কাছে যায় এবং তার মাথার কাছে গিয়ে দেখে সে আর কেউ না - তার চির শত্রু রানাই অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে!! তৌসিপ সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে রানাকে ধরে উঠিয়ে বসায় আর বলে তোর কিহয়েছে?রানা বল আমাকে? এ কথা বলতেই তৌসিপ অনুভব করলো রানার শরীর অনেক গরম। তৌসিপ রানার মাথায় হাত দিয়ে বলে রানা তোর তো অনেক জ্বর হয়েছে ভাই - চল চল তোকে বাড়ি পৌছে দেই। একথা বলে তৌসিপ রানাকে ধরে ধরে তার বাড়ি নিয়ে যায় এবং শুইয়ে দিয়ে আসে।

তৌসিপ তার বাড়ি চলে যায়। সেদিন রাতে তৌসিপ রানার কথা অনেক কল্পনা করে। ইস ছেলেটার কি জ্বর হয়েছে, কে জানে জ্বর কমলো কি না। এ সব ভাবতে ভাবতে তৌসিপ ঘুমিয়ে পড়ে এবং ঘুমের মধ্য সে রানাকে স্বপ্নে দেখে। পড়ের দিন সকালে তৌসিপ স্কুলে যায় কিন্তু রানা সেদিন স্কুলে আসেনি। তৌসিপ মনে মনে ভাবে আজও মনে হয় রানার জ্বর কমেনি - যাই ওর বাড়িতে ওকে দেখে আসি। এই বলে তৌসিপ রানার বাড়িতে যায়। রানার বাড়িতে ঢুকেই দেখে রানার মা বাড়ির উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে। তৌসিপ রানার মা কে জিজ্ঞেস করে কাকি মা, রানার শরীর এখন কেমন? রানার মা বলে তৌসিপ বাবা তুমি এসছো? দেখো বাবা কাল থেকে এত জ্বর রানার - কিছুতেই কমছে না।তুমি কাল রানাকে বাড়ি পৌছে না দিলে কি যে হত। যাও বাবা রানার কাছে যাও - ও ঘরে বিছানায় শুয়ে আছে। তৌসিপ রানার কাছে যায় এবং তার বিছানার পাশে বসে তৌসিপ রানার মাথায় হাত রেখে দেখে প্রচুর জ্বর তার শরীরে। তৌসিপ রানার মাথায় হাত রাখতেই রানা চোখ মেলে তাকায়, আর তাকিয়ে তৌসিপকে দেখে রানা কিছুটা অবাক হয়। রানা বলে তৌসিপ তুমি এসেছো?

একথা বলেই রানা উঠে বসতে চেষ্টা করে। তৌসিপ বলে না না রানা তুমি শুয়ে থাকো। একথা বলে তৌসিপ বাহির থেকে এক বালতি পানি নিয়ে যায় এবং রানার মাথায় পানি ঢালতে থাকে। রানার মা ঘরে আসে এবং রানাকে খাবার খাওয়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু রানা কিছুতেই খাবার মুখে নিতে চাচ্ছে না। তৌসিপ রানার মা কে বলে কাকি মা, আপনি যান কাজ করেন আমি রানাকে খাইয়ে দিচ্ছি। তারপর তৌসিপ খাবার হাতে নিয়ে রানাকে একটু একটু করে খাইয়ে দেয় এবং ঔষধ দেয়। এভাবে তৌসিপ সারাদিন রানাদের বাড়িতে বসে রানার সেবা যত্ন করছে, ওদিকে স্কুলের কথা ও বাড়ি ফেরার কথা তার মাথায়ই নেই। ওদিকে স্কুল ছুটি হয়ে গেছে সে এখনো বাড়ি ফেরেনি। তৌসিপের মা চিন্তিত হয়ে পড়ে ছেলেটা এখনো বাড়ি ফিরছে না কেন?

এদিকে তৌসিপের সেবা যত্নে রানা অনেকটাই সুস্থ। রানার মা তৌসিপ কে বলে বাবা,অনেক বেলা হয়েছে তুমি এবার বাড়ি যাও - তোমার বাড়ির মানুষ চিন্তা করবে। তৌসিপ রানাকে বলে রানা তুমি ঠিক ভাবে খেয়ে দেয়ে ঔষধ খাবে কিন্তু কালকে যাতে তোকে স্কুলে দেখতে পাই, বলে গেলাম কেমন? রানা মাথা নাড়িয়ে বলে হুম। তৌসিপ বাড়ি ফিরে যায় এবং বাড়ি যেতেই দেখে তার মা না খেয়ে বসে আছে - তার জন্য চিন্তা করছে।তৌসিপ গেলেই তার মা তাকে জোরে একটা থাপ্পর দেয়। তৌসিপ হাসি দেয় আর ওর মাকে জড়িয়ে ধরে একট পাপ্পি খায়। সে তার মাকে বলে মা আমার জন্য চিন্তা করো না। তারপর তৌসিপ তার মা কে সব কিছু খুলে বলে। তৌসিপের মুখে এসব কথা শুনে তৌসিপের মা মনে মনে ছেলেকে নিয়ে গর্ভ বোধ করেন।

সেদিন রাতে রানার শরীর সম্পূর্ণ ভাবে ভালো হয়ে যায়। রানা সারা রাত ধরে কল্পনা করে যার সাথে আমার এত দ্বন্দ্ব সে আমার জন্য এত কিছু করলো, এত কিছু ভাবলো? আমার তৌসিপের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। সেদিন কিছুতেই রানার রাত কাটছিল না -কখন স্কুলে যাবে! অবশেষে সকাল হল।খুব ভোরেই রানা প্রস্তুত হয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য রওনা হতে ই রানার মা রানাকে ডেকে বলে আজ তোর স্কুলে যেতে হবে না - কেবল জ্বর থেকে সুস্থ হয়ে উঠলি। আজ বাড়িতে বিশ্রাম নে। কিন্তু রানা তার মায়ের কথা শুনলো না - সে স্কুলে চলে গেল। খুব সকাল তখন, কেউ স্কুলে আসেনি। স্কুলের কক্ষগুলোও খুলে দেওয়া হয়নি। রানা স্কুলের বারান্দায় বসে তৌসিপের জন্য অপেক্ষা করছে। কখন তৌসিপ স্কুলে আসবে ভাবতেই কিছুক্ষন পর তৌসিপ স্কুলে আসলো। তৌসিপ রানাকে দেখে অবাক হয়ে গেলো। রানা তুমি!! আজ শরীরটা কেমন তোমার? আজ বাড়িতে শুয়ে বিশ্রাম নিতে! স্কুলে আসতে গেলে কেন? এ কথা বলতেই রানা তৌসিপ কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো এবং বললো আমাকে ক্ষমা করে দে।আমি তোর সাথেকত অন্যায় করেছি , তোকে কত বাজে কথা বলেছিকিন্তু আমি এখন বুঝতে পারছি তুই হলি আমার প্রকৃত বন্ধু।

দুই

তৌসিপ রানাকে বলে রানা তুমি এসব কি বলছো? সেসব কথা আমি কবেই ভুলে গেছি। তোমাকে আর ক্ষমা চাইতে হবে না - তুমি আর আমি এখন অনেক ভালো বন্ধু। ছাড়ো আমাকে - এখন সবাই চলে আসবে। দু’জনে স্কুলের বারান্দায় বসে গল্প করলো কতক্ষণ। এরপর স্কুল কক্ষ খুলে দেওয়া হলে ওরা দু’জন ক্লাসে ঢুকে। এরপর থেকে রানা ও তৌসিপ প্রতিদিনই স্কুলের ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই স্কুলে আসে এবং দু’জন মনের সুখে গল্প করে। একজনের স্কুলে আসতে দেরি হলে অন্যজন বসে তার জন্য অপেক্ষা করে। একদিন রানা ও তৌসিপ দু’জনেই স্কুলের মাঠে খেলছিল। তৌসিপ হঠাৎ পড়ে যায় ও হাতে অনেক জোরে আঘাত পার। তৌসিপকে পড়ে যেতে দেখে রানা খুব ভয় পেয়ে যায় এবং খুব জোরে তৌসিপ তৌসিপ বলে চিৎকার করে ওঠে। রানার চিৎকার শুনে স্কুলের শিক্ষক সহ সকলেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং তারা দৌরে তৌসিপের কাছে আসে। তৌসিপ কে ধরে কোলে করে ক্লাস রুমে নিয়ে যাওয়া হয় আর রানা খুব কান্না করতে থাকে তৌসিপের এ অবস্থা দেখে।

সেদিন রানা তৌসিপকে তার বাড়ি নিয়ে যায় - সারাদিন তার পাশে থেকে তাকে যত্ন করে। এভাবেই রানা আর তৌসিপের বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে - কেউ কাউকে একদিন না দেখে থাকতেই পারেনা। ওরা দু’জন মাঝে মাঝেই একসাথে কীর্তিনাশা নদীতে গোসল করতে যায়। তৌসিপের নৌকা ভ্রমন করতে খুব ভালো লাগে। রানা সব সময় তৌসিপের সব ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয় এবং তার সব ইচ্ছা পূর্ণ করার চেষ্টা করে। রানার এই বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা দেখে তৌসিপ দিন দিন মুগ্ধ হতে লাগলো। রানা আর তৌসিপ দুজনেই প্রাথমিক বিদ্যালয় পাস করেছে। তারা পাশের গ্রামে একটি হাই স্কুলে ভর্তি হয় কারন তাদের গ্রামে কোন হাই স্কুল নেই। প্রতিদিন তাদের পায়ে হেটে স্কুলে যেতে হয়। রানার ভাই রানাকে একটি সাইকেল কিনে দেয়। রানা প্রতিদিন তার সাইকেলের পিছনে বসিয়ে তৌসিপকে স্কুলে নিয়ে যায় এবং নিয়ে আসে।

তৌসিপের বাবা-মা রানাকে খুব ভালোবাসেন এবং খুব ভরসা করেন। তেমনই রানার পরিবারও তৌসিপকে অনেকটা স্নেহ করে - কখনোই রানাকে আর তৌসিপকে আলাদা চোখে দেখে না। রানা আর তৌসিপ সব সময় একসাথে স্কুলে যায়, একসাথে ক্লাস রুমে বসে এবং একসাথেই সারাক্ষন সময় কাটায়। তাদের এভাবে একসাথে চলতে দেখে অনেকেই মনে করে ওরা দু’জন আপন দুই ভাই। যখন তারা জানতে পারে ওরা ভাই না তখন সবাই অবাক হয়! কারন আপন ভাই না হয়েও দুটি ছেলের মধ্যে এতটা মিল, এতটা সম্পর্ক হতে পারে?!! একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে দু’জনে দেখতে পায় কীর্তিনাশা নদীর পারে একটি নৌকা বাধা আছে। ওমনি তৌসিপ দৌড় দিয়ে নৌকায় গিয়ে বসে। রানাও তার পেছনে পেছনে যায় এবং নৌকায় গিয়ে বসে। রানা নৌকার ছাউনির ভেতরে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে - ওমনি তৌসিপ রানান কোলের মধ্যে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।

তৌসিপ রানার হাত দুটো খুব শক্ত করে ধরে বলে রানা তুমি কি আমাকে ভালোভাসো? রানা বলে তৌসিপ, সে কথা কি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে? তৌসিপ বলে বলো না রানা তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না?? রানা বলে তৌসিপ তুমি আমার জীবনের একটা অংশ - তোমাকে যে আমি কতটা ভালোবাসি তা আমি নিজেও কল্পনা করতে পারি না। রানার মুখে এসব কথা শুনে তৌসিপ স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলে। তৌসিপ রানার কোল থেকে উঠে বসে এবং রানার পাশে হেলান দিয়ে বসে। তখন রানা তৌসিপের কোলের মধ্যে শোয়, তৌসিপ রানার মাথা বুলিয়ে দেয় - তৌসিপ রানাকে বলে রানা তোমার কোলে শুইলে আমার মনে হয় আমি এত এত এত শান্তির জায়গায় আছি।

তারা দু’জন অনেকক্ষন গল্প করতে থাকে নৌকায় বসে - সেদিন স্কুলের সময়টা তারা নৌকায় বসেই কাটিয়ে দেয়। ভুলে যায় স্কুলে যাওয়ার কথা। সেদিন স্কুল থেকে তাদের বাড়িতে বিচার যায় তারা স্কুলে যায়নি। বাড়িতে গেলে তৌসিপকে তার বাবা অনেক মার দেয় এবং রানাকে তার বড় ভাই অনেক মার দেয়। একদিন তৌসিপের বাবা-মা শহরে তার বড় বোনের বাসায় বেড়াতে যায় - সামনে তৌসিপের পরীক্ষা তাই তৌসিপকে তাদের সাথে নিয়ে যেতে পারবে না। তৌসিপ বাড়িতে একা থাকতে ভয় পায় তাই তৌসিপের মা রানা কে ডেকে বলেন, রানা বাবা আমরা তো আজ ঢাকায় যাচ্ছি - আমরা না আসা পর্যন্ত তুমি আমাদের বাড়িতে তৌসিপের কাছে থেকো। তৌসিপের বাবা-মা ঢাকায় চলে গেলো সেদিন। তৌসিপ আর রানা একসাথে তৌসিপদের বাড়িতে থাকে - রাতে তৌসিপ নিজের হাতে রান্না করে এবং রানাকে খেতে দেয়। তখন রানা তৌসিপকে মজা করে বলে আহা যেভাবে খাবার দিলে মনে হল আমার বৌ আমাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। রানার মুখে এমন কথা শুনে তৌসিপ মনে মনে অনেক খুশি হয়।

তিন

রাতে খেয়ে দেয়ে দু’জনে শুয়ে পড়ে। তৌসিপ তার মাথাটা রাখে রানার বুকের উপরে। তৌসিপ বলে রানা আমি তোমার বুকের উপর মাথা রাখালে তোমার কি কষ্ট হচ্ছে? রানা বলে কি যে বল না!! তৌসিপ তোমাকে এভাবে পেয়ে আমার স্বর্গীয় সুখ অনুভব হচ্ছে।তৌসিপ বলে রানা, তোমাকে একটা কিস করি? একথা বলতে ওমনি রানা নিজেই তৌসিপ কে কিস করে বসে। হা হা আমি ফার্ষ্ট হয়েছি, তৌসিপ এবার রানাকে খুব জোরে শক্ত করে ধরে একটি কিস দেয়। তখন রানা বলে হুহ শুধু মাত্র একটা??!! না না এই একটা কিসএ আমার হবে না আমার আরো কিস চাই। তারপর তৌসিপ জোরে জোরে অনেকগুলো কিস করতে থাকে, তারপর রানা তৌসিপকে জড়িয়ে ধরে। তৌসিপও রানাকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দেয়। তৌসিপ বলে রানা তোমাকে আমি হারাতে পারবো না। আমি যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমার আর আমার ভালোবাসার ভাগ আমি কাউকে দিতে পারবো না। আমি শুধু তোমার আর তুমি শুধুই আমার।

রানা তৌসিপের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে তৌসিপ, আমিও তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু তোমাকে বলতে পারিনি আমার ভালোবাসার কথা।তৌসিপ বলে আমিও তোমাকে অনেকবার বলতে চেয়েও বলতে পারিনি তোমাকে হারাতে হয় যদি? যদি আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়?!!! রানা তৌসিপের মুখে হাত দেয়। চুপ, আর এসব কথা বলবে না। প্রথম থেকেই তুমি যা চেয়েছো আমি তা পূর্ণ করার চেষ্টা করছি, তাহলে কি করে ভাবলে আমি তোমার এই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিব? শুনো তৌসিপ, আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি। তুমি আমার জীবনের সাথে যুগপৎ ভাবে জড়িয়ে আছ। তুমি আমার জীবনের অর্ধেক অংশ - আমিও যে তোমাকে ভালোবাসি। একথা বলে রানা তৌসিপ কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। তৌসিপ রানার চোখের জল মুছে দিয়ে বলে রানা তুমি আমার বুকে মাথা রেখে শোও তো। রানা তৌসিপের বুকে মাথা রেখে শোয় - তখন তৌসিপ রানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমাও। তারা দু’জন দু’জন কে জড়িয়ে ধরে সেদিন সারারাত ঘুমিয়ে ছিলো।

তারা দু’জন বিদ্যলয়ের সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে। একদিন তাদের স্কুলের চারুকলা ও নাট্যকলা বিভাগের প্রধানমনোজ স্যার সব ছাত্রদের কে ডেকে বলেন সামনে পহেলা বৈশাখ আর কীর্তিনাশার পারে বিশাল এক বৈশাখী মেলা হতে যাচ্ছে। সেই মেলায় আমাদের স্কুলের নাট্যকলা বিভাগ থেকে নাটকের ব্যাবস্থা করা হচ্ছে। তোমরা কে কে নাটকে অভিনয় করতে চাও? রানা আর তৌসিপ দু’জনেই হাত তোলে। মনোজ স্যার ওদের দু’জনকেই নাটকের নায়ক নাইকার চরিত্রে অভিনয় করার জন্য বাছাই করেন। বৈশাখী মেলার নাটকে রানা স্বামী হয় এবং তৌসিপ স্ত্রী হয়ে অভিনয় করে। নাটকে একটা সংলাপে স্ত্রী তার স্বামীর পা জড়িয়ে ধরে বলে - স্বামী তুমিই আমার ইহকাল, তুমিই আমার পরকাল, তুমিই আমার বিধাতা। স্বামী তুমি আমায় ছেড়ে যেও না যেও না। এই অভিনয়টি করার সময় রানা তৌসিপ কে সবার অগোচোরে একটা চোখ মারে। তৌসিপ মুচকি হেসে ফিস ফিস করে বলে বান্দর মঞ্চ থেকে নামো তারপর তোমার খবর আছে।

বৈশাখী মেলায় নাটক শেষ করে সেদিন রানা তৌসিপকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়, সেদিন রাতে তৌসিপ রানার বুকের মধ্যে শুয়ে রানার হাত দু’টো ধরে বলে আচ্ছা রানা আজ নাটকে আমি যখন তোমার বউ হয়েছি, তখন তোমার কেমন লাগছিলো? রানা বলে তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল তুমি সত্যিই আমার বউ! তৌসিপ বলে আচ্ছা রানা আমরা কি বিয়ে করতে পারি না? আমরা কি পারি না দু’জন স্বামী-স্ত্রীর মত হয়ে থাকতে? রানা বলে হ্যা পারি - আমি তোমাকে বিয়ে করবো তৌসিপ। এরপর বিয়ে নিয়ে তারা প্রতিদিন অনেক অনেক পরিকল্পনা করে। আমরা বিয়ে করে এটা করবো সেটা করবো ঘুরতে যাবো আরো কত কি। বিয়ে নিয়ে তারা অনেক স্বপ্ন আঁকে। অবশেষে একদিন দু’জনে বিয়ে করবে বলে ঠিক করে। রানা বলে আচ্ছা তৌসিপ আমাদের বিয়ে পড়াবে কে? কিভাবে আমরা বিয়ে করবো? তৌসিপ বলে আমার মাথায়ও কিছু ধরছে না কিভাবে আমাদের বিয়েটা হবে?

রানা বলে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসছে। তৌসিপ বলে কি বুদ্ধি? কীর্তিনাশার নদীর পারের মাজারে কি আমরা বিয়েটা করতে পারি না? তৌসিপ বলে মাজারে? কিন্তু কিভাবে? রানা বলে চল আমরা দু’জন গলায় মালা পরে মাজারে গিয়ে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে, আল্লাহ’র কাছে প্রর্থনা করবো যাতে তিনি আমাদের এই ভালোবাসার বিয়ে কবুল করে নেন। সেদিন রাতে তারা দু’জন ঐ মাজারে গেলো। সন্ধ্যার পর মাজারের আশে পাশে কোন লোক জন থাকে না। মাজারটি একটি নির্জন জায়গা - ওরা দু’জন ঢুকেই দেখে মাজারের মধ্যে ধুলো আর বালুতে ময়লা হয়ে আছে। তৌসিপ কীর্তিনাশার ঘাট থেকে পানি নিয়ে আসলো এবং মাজারের এক পাশে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করলো এবং তারা দু’জনে সেখানে বসে নফল নামাজ পড়ে মোনাজাত করে দু’জন দু’জন কে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে গ্রহন করে নেয়। তারপর তারা দুই জন মাজার থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার পথে রানা তৌসিপের হাত ধরে হাতে একটা কিস করে বলে আজ থেকে আমাদের জীবন নতুন ভাবে শুরু। তৌসিপ বলে রানা, আমি সারা জীবন তোমাকে নিয়ে সুখি হতে চাই। রানা বলে হুম, আমিও। তারপর তারা দু’জনে তাদের যার যার বাড়িতে চলে যায়।

পরের দিন সকালে রানা তৌসিপদের বাড়ির সামনে সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছিল তৌসিপকে নিয়ে স্কুলে যাবে বলে। তখন ওদের স্কুল বন্ধু রনির সাথে দেখা হয় রানার। রনি রানাকে বলে তোকে এভাবে দেখলে মনে হয় একজন জামাই তার বৌয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। সত্যিই রে তোদের দু’জনকে জামাই-বৌয়ের মতই লাগে। রানা একটু মুচকি হেসে বলে হুম - তৌসিপ আমার বন্ধু, তৌসিপ আমার বৌ, তৌসিপ আমার সব - একথা বলে রানা আর রনি দু’জনে খুব জোরে হা হা করে হেসে ওঠে। তখনই তৌসিপ চলে আসে। তারপর রানা তার সাইকেলের পেছনে বসিয়ে তৌসিপকে নিয়ে স্কুলে যায়। সামনে তাদের ৭ম শ্রেনীর বার্ষিক পরীক্ষা তাই লেখাপড়ার চাপ খুব বেশি। রানা তেমন ভালো ছাত্র না। তৌসিপ সব সময় রানাকে পরীক্ষায় পাস করতে সাহায্য করে পরীক্ষার সময়। সেদিন শ্রেনীতে গনিতের শিক্ষক আব্দুর রহিম স্যার এসে তৌসিপ কে বলতেছে শুনো তৌসিপ - তুমি সব সময় রানাকে পরীক্ষার সময় সাহায্য কর তা আমাদের চোখে পড়ে। এ বছর তোমাদেরকে কিন্তু বেঞ্চের পাশাপাশি বসতে দিবো না! পিছনের সারির বেঞ্চ থেকে উঠে রনি মসকারা করে বলে উঠলেন না না স্যার এ কাজ করবেন না - ভাবি যদি ভাইকে সাহায্য না করে তাহলে বেচারাকে কে সাহায্য করবে?!!!

চার

রনির কথা শুনে ক্লাস রুমে সবাই জোরে হেসে উঠলেন। সেই থেকে স্কুলে সবাই রানাকে ভাই আর তৌসিপকে ভাবি বলে ডাকতেন। এমনি করেই রানা আর তৌসিপ স্কুল জীবন পার করলেন। সামনে তাদের এস,এস,সি পরীক্ষা। পড়া নিয়ে দু’জনেই খুব ব্যস্ত। অবশেষে দু’জনেই এস,এস,সি পরীক্ষা দিল এবং পরীক্ষার ফলাফলও দেওয়া হলো। তৌসিপ ফার্ষ্ট ক্লাসে পাস করলো কিন্তু রানা দুই বিষয়ে খারাপ করলো!!! রানার বাবা-মা রানাকে খুব মারলো এবং রানার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে তাকে কৃষি কাজে মাঠে নামিয়ে দিল। এদিকে তৌসিপ তার বাবা মায়ের ইচ্ছা পূর্ন করতে ঢাকার একটা বড় কলেজে ভর্তি হলো এবং তার বোনের বাসায় থেকে লেখাপড়া করতে বাধ্য হল। তৌসিপ গ্রাম ছেড়ে তার বোনের বাসায় থেকে লেখাপড়া করে তাই এখন তৌসিপ আর রানার আগের মত প্রতিদিন দেখা হয় না, কথাও হয় না! দু’জন দু’জনকে ছাড়া দূরে থাকতে দু’জনেরই খুব কষ্ট হয়! দুজনেই একাকীত্ব অনুভব করে আর নিরবে শুধু কাঁদে!!

একদিন রানার বড় ভাই সিদ্ধান্ত নিলো রানাকে আর দেশে রাখবে না! রানাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেবে। একথা শুনে রানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো!!! সেদিন সারা রাত ধরে রানা তৌসিপকে ভেবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে! রানা মনে মনে ভাবে দেশে থাকলে তৌসিপের সাথে দেখা হওয়ার সুযোগ আছে কিন্তু বিদেশ চলে গেলে তো বছরে একবারও দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না! একথা ভাবতেই রানা মানুষিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে - চোখের পানিতে তার বালিশ ভিজে যায়!! রানার খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে তৌসিপ কাছে নেই বলে - তাকে কিছু বলতেও পারছে না। এদিকে রানার পরিবার তাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অবশেষে রানাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য সমস্ত কাগজ পত্র হয়ে যায়। ঐ দিকে তৌসিপ লেখাপড়া নিয়ে খুব ব্যস্ত। সে কিছুতেই কলেজ থেকে ছুটি পাচ্ছে না। তার মনটাও বড় ব্যাকুল হয়ে আছে রানার সাথে দেখা করার জন্য।

এত ব্যাকুলতার মধ্যে থেকেও তৌসিপ কিছুতেই আসতে পারতেছে না রানার সাথে দেখা করার জন্য! রানার বিদেশ যাওয়ার তারিখ পড়ে যায়। রানা ভাবে যে করেই হোক বিদেশ চলে যাওয়ার আগে একবার তৌসিপের সাথে দেখা করতে হবে এবং তাকে সবটা জানাতে হবে। একদিন খুব সকালে রানা তৌসিপের কলেজের সামনে যায়। দাড়োয়ানকে দিয়ে তৌসিপের কাছে খবর পাঠায়। রানার নাম শুনে তৌসিপ দৌড়ে ছুটে আসে। এসে দেখে রানা দাঁড়িয়ে আছে। রানাকে দেখে তৌসিপ অবাক হয়ে যায়! তার প্রানের প্রিয় রানাকে দেখতে রোগা রোগা দেখাচ্ছে - মনে হয় অনেকদিন ধরে কিছু খাচ্ছে না! তৌসিপকে জড়িয়ে ধরে বলে এটা তোমার কি হয়েছে? শরীর তো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে - চেহারাটা ভেঙ্গে গেছে। আমার রানাকে আমিই চিনতে পারছি না! তোমার কি হয়েছে রানা? বল আমাকে?

রানা তার বিদেশ যাওয়ার কথা কিভাবে বলবে সেটা বলার ভাষা খুজে পাচ্ছে না। তৌসিপ যখন রানাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো তখন রানার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ে তৌসিপের পিঠ ভিজে যাচ্ছিলো! তৌসিপ অনুভব করতে পারলো রানা কাঁদছে। তৌসিপ রানার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে এই তুমি এমন করছো কেনো? রানা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে ফেলে আমাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছে। আগামী মাসের তিন তারিখে আমার ফ্লাইট! রানার মুখে এ কথা শুনে তৌসিপ দাঁড়ানো থেকে বসে পড়ে - খুব কান্না করতে শুরু করে তৌসিপ! দু’জনে দু’জনের হাত ধরে একসাথে কান্না করতে থাকে! এখানে যেন কান্নার বন্যা বয়ে যাচ্ছে!! রানা বলে অনেকক্ষন হয়েছে আমি তোমার কাছে এসেছি। ওদিকে বাড়িতে কিছু বলে আসিনি। আমাকে এখন যেতে হবে - তুমি পারলে চলে এসো। আমি চাই তুমি আমাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌছে দিয়ে এসো - একথা বলে রানা চলে যায়। রানার ফ্লাইটের দিন চলে আসে। তৌসিপ আর রানার বড় ভাই রানাকে নিয়ে বিমানবন্দর যায়। রানা যখন বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করছিলো তখন দু’জনে আবার দু’জনকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে শুরু করে। রানার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল তেমনি তৌসিপের চোখের পানিও গড়িয়ে পড়ছিল। রানা যখন ভিতরে ঢুকে যায় তখন বার বার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিল আর মায়াবী দৃষ্টিতে তৌসিপকে দেখছিল! তৌসিপও বার বার পেছন ফিরে রানাকে দেখছিলো আর কান্না করছিলো।

পাঁচ

রানা মালয়েশিয়া চলে যায় এবং প্রথম দুই -তিন মাস তৌসিপের সাথে কোন যোগাযোগ থাকে না। এরপর রানা তৌসিপকে একটা চিঠি পাঠায়। প্রিয় তৌসিপ আমার জান, আমার প্রাণ আমার বৌ। আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়া ভালো নেই। আমিও তোমাকে ছাড়া একটুও ভালো নেই। আর তুমি ছাড়া ভালো থাকবো কি করে তা তো তুমি জানোই? যাই হোক আমার জন্য তুমি চিন্তা করো না - আমি সুস্থ আছি। আমাদের পাশের বাড়ির মোমেনভাই এখানে থাকে। সে আগামী মাসে দেশে যাবে আর আমি তোমার জন্য একটা মোবাইল ফোন কিনেছি। মোমেন ভাই দেশে আসলে তার কাছে তোমার জন্য মোবাইলটি পাঠিয়ে দেবো। তারপর আমাদের প্রতিদিন কথা হবে। তুমি নিজের শরীরের যত্ন নিও আর ঠিক ভাবে লেখাপড়া করো। ইতি তোমার রানা।

রানার মোবাইল ফোনটি তৌসিপ হাতে পায়। মোবাইলটি পেয়ে তৌসিপ অনেক খুশি হয় - যেন স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলে। এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে, দুপুরে, রাতে, সব সময় রানা তৌসিপকে ফোন দেয়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও দু’জনের কথা না হলে যেন দু’জনের ঘুম হয় না। তৌসিপ বলে তুমি বিদেশ গেছো টাকা উপার্জন করতে আর সব টাকা যদি মোবাইলে খরচ করে ফেলো তাহলে কিভাবে হবে? রানা বলে ধ্যাত বাদ দাও তো - তোমার সাথে কথা না বললে আমার মাথাই ঠিক থাকে না। আর মাথা ঠিক না থাকলে কাজ করবো কিভাবে? এভাবে রানা বিদেশে প্রায় এক বছর পার করে ফেলে এবং দেশে আসার পরিকল্পনা করে। রানা তৌসিপ কে ফোনে বলে তোমাকে ছাড়া আর থাকতে পারছি না - এবার দেশে আসতে হবে ছুটিতে। রানার কথা শুনে তৌসিপ তো খুশিতে আত্মহারা। তৌসিপ রানার জন্য অপেক্ষার দিন গুনতে থাকে।

অবশেষে রানা দেশে আসে। তৌসিপ রানাকে আনতে বিমানবন্দর যায়। রানা আর তৌসিপ তাদের গ্রামে আসে - আবার তারা দু’জন একসাথে কীর্তিনাশা নদীতে নৌকায় ভ্রমন করে, অনেক মজা করে। রানা তৌসিপকে বলে আচ্ছা তৌসিপ তোমার মনে আছে? একদিন তুমি আমাকে বলেছিলে তোমার পাহাড় দেখতে যেতে খুব ইচ্ছে করে? তৌসিব বলে হুম মনে আছে কিন্তু কেন বল তো? রানা বলে আমি তোমাকে নিয়ে পাহাড় ঘুরতে যাবো ভাবছি। রানার কথা শুনে তৌসিপ আনন্দে ইইইই করে চিৎকার করে বলে সত্যি বলছো আমরা পাহাড়ে যাবো? রানা মাথা নাড়িয়ে বলে হুম সত্যি আমরা পাহাড়ে ঘুরতে যাবো। তৌসিপ বলে ওয়াও আমার কত দিনের স্বপ্ন তোমাকে নিয়ে পাহাড়ে যাবো।

তারা দুইজন রাতের গাড়িতে ওঠে। সেদিন সারারাত গাড়িতে তৌসিপ রানার কাধে মাথা রেখে ঘুমায় এবং পরের দিন সকালে তারা পাহাড়ে গিয়ে নামে। সেখানের একটি হোটেলে তারা একটা ঘরে ওঠে। একটু বিশ্রাম নিয়ে তারা পাহাড়ে ঘুরতে যায় - দুজনে মিলে অনেক ছবি তোলে, অনেক আনন্দ করে এবং পাহাড়ী ঝর্নায় গোসল করতে নামে। ওই এলাকার সবচেয়ে উচু পাহাড়টি দেখে তৌসিপ বলে ঐ পাহাড়ের চুড়ায় উঠবে সে। তৌসিপের কথা রাখতে রানা তৌসিপকে নিয়ে সেই পাহাড়ের চুড়ায় ওঠে এবং তারা দুজনেই ক্লান্ত হয়ে যায় এবং একটা গাছের ছায়ায় অনেকক্ষন তারা সেখানে বসে থাকে। রানা বলে তৌসিপকে - চুপ করে আছো কেনো - কিছু বলছো না যে? তৌসিপ বলে আচ্ছা রানা, তোমাকে একটা কথা বলবো বলবো ভাবছি কিন্তু আমার মনে থাকে না।

ছয়

রানা বলে কি কথা এখন বলো? তৌসিপ বলে আমি একটি সাধারন জ্ঞান বইতে পড়েছি বিদেশে নাকি ছেলে-ছেলে এবং মেয়ে-মেয়ে বিয়ে হয়? আবার ছেলেরা নাকি সার্জারি করে মেয়েও হয়ে যেতে পারে? রানা বলে হুম আমিও শুনেছি তবে মালয়েশিয়াতে এটা হয় না। আরো বড় রাষ্ট্রে হয়, এই ধরো আমেরিকায় হয়। তৌসিপ বলে ইস আমি আর তুমি যদি সে দেশে চলে যেতে পারতাম তাহলে কতই না ভালো হতো তাই না? রানা বলে হুম ঠিক বলছো। আচ্ছা তৌসিপ চলো আমরা দু’জন সেই দেশে চলে যাই। তৌসিপ বলে কিন্তু কিভাবে? আমরা দু’জনেই তো অনেক গরীব, সেখানে যেতে তো অনেক টাকা লাগে তাই না? রানা বলে হুম তা ঠিক বলছো, কিন্তু ইচ্ছা থাকলে মানুষ সবকিছু করতে পারে। আমরা যদি মন থেকে চেষ্টা করি তাহলে আমরাও যেতে পারবো!

তৌসিপ বলে কিভাবে চেষ্টা করবো বলো আমাকে? রানা বলে আমি তোমাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাবো এবং দু’জনে সেখানে কাজ করে অনেক টাকা জমাবো তারপর আমরা সেখান থেকে অ্যামেরিকা চলে যাবো। কি বলো যাবে আমার কাছে মালয়েশিয়া? তৌসিপ বলে ওয়াও এতো খুব ভালো বুদ্ধি? হ্যা অবশ্যই যাবো। তুমি আমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাবস্থা করো। আমার পরিবার অবশ্য মানবে না - তবে আমি তাদের না বলেই চলে যাবো। এতে যা হওয়ার হোক। রানা বলে এবার মালয়েশিয়া গিয়েই আমি তোমার জন্য ভিসা পাঠাবো কি বলো? তৌসিপ বলে হুম ঠিক আছে। রানা বলে আমার হাতে হাত রেখে কথা দাও। তৌসিপ রানার হাতে হাত রেখে বলে কথা দিলাম।

তারা বিকেলে পাহাড় থেকে নেমে যায় এবং পাহাড় থেকে নামতে নামতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। রাতে তারা হোটেলে থাকে - রাতে রানা তৌসিপের বুকের উপর শুয়ে বলে জানো, তোমাকে বিয়ে করার পর তো আমাদের হানিমুন করা হয়নি, তাই এটাই আমাদের হানিমুন। দু’জনে খুব হাসে। পরের দিন সকালের গাড়িতে তারা আবার নিজেদের গ্রামে ফিরে যায়। রানা বিদেশ থেকে আসার পর ওদের দু’জনের ভালই দিন কাটছিলো। এমনি করে রানার ছুটিও শেষ হয়ে এলো। তৌসিপেরও সামনে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। রানার মালয়েশিয়া ফিরে যাওয়ার দিন চলে এলো - রানা তৌসিপকে কিছু টাকা দিয়ে বলে এই টাকাটা তুমি নিজের কাছে রাখো - পাসপোর্ট করার সময় লাগবে, আর শুনো, আমি যেভাবে যেখানে যেতে বলবো সেখানে গিয়ে পাসপোর্ট করে ফেলবে কিন্তু কেমন? তৌসিপ বলে আচ্ছা ঠিক আছে জান। রানার ফ্লাইট চলে আসে। সে মালয়েশিয়া ফিরে যায় আর তৌসিপ তার বোনের বাসায় ফিরে যায়।

তাদের আগের মত আবার ফোনে কথা চলতে থাকে, তৌসিপ পরীক্ষা শেষ করে কিছু দিনের জন্য বাড়িতে আসে। দুপুরে রানার সাথে ফোনেও কথা হয়। বিকালে তৌসিপ বাড়ির পাশের একটা মাঠে দূর্বাঘাসের উপর বসে বসে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছে তা দেখছে। এরই মাঝে রানার চাচাতো ভাই মাইদুল দৌড়ে এসে হাপিয়ে হাপিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে তৌসিপকে কিন্তু বলতে পারছে না। তোসিপ বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায় আর বলে কি হয়েছে তোর? মাইদুল তুই এমন করছিস কেন? মাইদুল বলে তৌসিপ ভাই! তৌসিপ ভাই! রানা ভাই আর বেচে নাই! রানা ভাই মারা গেছে। কিছুক্ষন আগে মালয়েশিয়া থেকে ফোন আসছে রানা ভাই নাকি এক্সিডেন্টে মারা গেছে! মাইদুলের কথা শুনে তৌসিপ মাইদুলকে জোরে একটা থাপ্পর দিয়ে বলে তুই কি রে মাইদুল? নিজের আপন চাচাতো ভাইকে নিয়ে এমন মসকারা করতে তোর লজ্জা লাগলো না?

মাইদুল জোরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে আর বলে আমি মিথ্যা বলছি না!! এরই মাঝে পুরা এলাকায় খবর হয়ে গেছে রানা মারা গেছে! তাই সবাই ছুটাছুটি করে রানাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তৌসিপ দৌড়ে রানাদের বাড়ি গিয়ে দেখে রানার বাবা-মা, ভাই-বোনেরা সবাই আর্তনাদ করে কান্না করছে। এই নির্মম দৃশ্য দেখে তৌসিপ রানা বলে জোরে একটা চিৎকার দেয় এবং মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পরে যায়!! দিনটি ছিলো ১১ সেপ্টেম্বর ২০১২ সাল। সবাই তৌসিপকে ধরে তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। এরপরে তৌসিপের খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ হয়ে যায় - সারাদিন কাঁদে আর রানার ছবি বুকে নিয়ে রানা রানা করে!!! তার এক মাস পর রানার মৃতদেহ দেশে আনা হয়।

সবাই তৌসিপ কে ধরে ধরে রানাদের বাড়ি নিয়ে যায় শেষ বারের মত একবার দেখানোর জন্য। রানার দাফন কাফন হয় - সে সব দৃশ্য তৌসিপ নিজের চোখে প্রত্যাক্ষ দেখে সহ্য করতে না পেরে বাড়ি গিয়ে ঘরের দরজা দেয় এবং এক বোতল কিটনাশক খায়। সবাই দরজা ভেঙ্গে তৌসিপকে ঘর থেকে আধমরা অবস্থায় বের করে এবং এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং ৭দিন পরে তৌসিপের জ্ঞান ফিরে আসে। তৌসিপ প্রাণে বেচে গেলেও রানার মৃত্যুর সাথে সাথে তার মনটাও মরে গেছে। তৌসিপ অনেক মানসিক আঘাত পেয়ে মানসিক রোগি হয়ে যায় - লেখাপড়া বন্ধ করে দেয়। জীবন্ত দেহে সে নিজেকে মৃত ভাবতে থাকে!! তৌসিপ হয়ে যায় নিথর নিস্তব্ধ একটি ছেলে!!

সম্পাদকের মন্তব্যঃ

সত্যিকারের জীবনী থেকে নেয়া।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি