একটি প্রকৃতি বিরুদ্ধ প্রবন্ধ
অনিন্দ্য অ্যাঞ্জেল

২৬ জানুয়ারী ২০১৮



অনেকেই আছেন সবকিছুতে “প্রকৃতির বিরুদ্ধতা” খুঁজে বেড়ান৷ যেমন, তাঁরা বলেন যে সমকামিতা নাকি “প্রকৃতি বিরুদ্ধ”৷ প্রকৃতি-প্রেম যদি তাঁদের এত বেশি উতলে ওঠে তাহলে কেন তাঁরা পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন না? নদী-নালা, খালবিলে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য ফেলে যখন জলজ সম্পদকে ধ্বংস করা হয়, সেই কাজগুলি কি “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” নয়?

সৌন্দর্য্য বাড়াতে অনেক নারী প্লাস্টিক সার্জারী বা কসমেটিক সার্জারী করে জন্মগত পাওয়া চেহারার পরিবর্তন ঘটান, এটাও কি “প্রকৃতির বিরুদ্ধতা” নয়? অনেক ডাক্তার মহিলাদের স্বাভাবিক সন্তান জন্ম না দিতে উৎসাহিত করেন এবং সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে পেট কেটে বাচ্চা জন্ম দিতে বাধ্য করেন৷ এটাও কি “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” নয়? নাকি এটা প্রকৃতির পক্ষে করা একটি কাজ? আমরা মানুষ নামক প্রাণীটি হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি সাধন করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে এই পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি, এটা কি “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” কাজ নয়? প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী মানুষ ব্যতীত অন্য কোন প্রাণী জামা-কাপড় পরে না৷ তাহলে মানুষ কি “প্রকৃতির বিরুদ্ধ”-এ কাজ করছে না? হিসাব করলে আমরা মানুষ নামক প্রাণীটি হাজার হাজার কাজ করছি যা প্রকৃতি বিরুদ্ধ৷ তাহলে কেন শুধু সমকামী ব্যক্তিদেরকে আঘাত করার জন্য কিছু সংখ্যক লোক সমকামিতাকে “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” বলছেন?

কোন কাজটা প্রকৃতির বিরুদ্ধ, কোন কাজটা প্রকৃতির পক্ষে সেটা নির্ধারণ করার মানদন্ড কি? এবং কে তাঁদেরকে এই বিচার করার অধিকার দিয়েছে? কোন বিষমকামী দম্পতির যদি সন্তান না হয়, কোন কারনে যদি তাঁরা বন্ধ্যা হন, তাহলে কি তাঁরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে ধরে নেব যেহেতু তাঁরা বংশবিস্তার করছেন না? অনুগ্রহপূর্বক পক্ষপাতহীন মন নিয়ে একটু যুক্তিসংগতভাবে ভাবুন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সাহায্য নিন৷ হাজার হাজার প্রাণী এবং উদ্ভিদ সমকামী৷ আপনার অজ্ঞতা বা জ্ঞানের স্বল্পতা, আপনার অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস, আপনার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী ও বৈষম্যপূর্ণ পক্ষপাতমূলক মানসিকতা অন্য মানুষকে বিচার করার মাপকাঠী কোনভাবেই হতে পারে না৷ আর অন্যকে বিচার করার অধিকার বা কর্তৃত্ব বা অনুমোদন কে আপনাকে দিয়েছে?

যীশু খ্রীষ্টের সময় একবার যিহুদী যাজকগণ এক নারীকে ব্যাভীচারের দায়ে হত্যা করতে উদ্যোত হয়েছিল৷ যীশু তাদেরকে বলেছিলেন যে যদি কেউ নিজে নিষ্পাপ বা নির্দোষ না হয়, তাহলে সে কোনভাবেই অন্যকে বিচার করতে পারে না৷ অতএব অন্যকে বিচার করার আগে নিজে নিষ্পাপ বা নির্দোষ কিনা তা আগে ভাবুন৷ সমকামী ব্যক্তিরা আপনার কোন ক্ষতি করছে না, তাহলে কেন আপনি তাদের পিছনে উঠে পড়ে লেগেছেন তাদেরকে ক্ষতি করবেন বলে? আগে নিজে “প্রকৃতির পক্ষে” কাজ করে দেখান, তারপরে কে “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” কাজ করছে সেটা নিয়ে ভাববেন৷

তৎকালীন ব্রিটিশ রাণী ভিক্টোরিয়া দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা আইনটি তৈরি করে বলেছেন যে “পায়ু পথে সঙ্গম হলো প্রকৃতি বিরুদ্ধ”৷ মজার ব্যাপার হলো মহারাণী ছিলেন শাসক ও কথিত আছে পৃথিবীর অর্ধেকই নাকি মহারাণীর অধিনস্থ ছিল, তাঁর সাম্রাজ্যে নাকি সূর্য অস্ত যেত না৷ কিন্তু তাই বলে কে কার স্ত্রীর পায়ু পথে সঙ্গম করবে, কে কে সমকামী এবং পুরুষে পুরুষে পায়ুপথে সঙ্গম করবে কি করবে না তা বলার অধিকার রাণীর ছিল না৷ হ্যাঁ, তিনি রাণী ছিলেন, কিন্তু তাই বলে মানুষের “পায়ুপথ”-কে নিশ্চয়ই কিনে নেননি৷ রাণীর পায়ুপথ নিরাপদ থাকলেই হলো, অন্যদের পায়ুপথে কি হচ্ছে না হচ্ছে সে বিষয়ে রাণীর নাক না গলালেও চলতো৷

শিয়াল যখন আঙ্গুর ফল পায় না বা আঙ্গুর ফলের নাগাল পায় না তখন সে আঙ্গুর ফলকে বলে “টক”৷ তেমনি রাণীমা পায়ুপথে সঙ্গম হতে বঞ্চিত হয়েছিলেন হয়তো, তাই সেটা সম্পর্কে বলেছেন “প্রকৃতি বিরুদ্ধ”৷ এখন যুগ বদলেছে, ব্রিটিশ রাজ আর নেই, পাকিস্তানী হানাদাররাও নেই, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাও প্রায় ৪৭ বছর৷ তাহলে কেন আমরা ব্রিটিশ রাণী ভিক্টোরিয়ার দালালী করবো? আমরা কি স্বাধীন হইনি? নাকি বাংলাদেশ এখনও ব্রিটেনের উপনিবেশ? স্বাধীন দেশের নাগরিকরা যখন ঔপনিবেশিক শক্তির দালালী করে তখন সেটাই বরং “প্রকৃতি বিরুদ্ধ” কাজ, পায়ুপথে আঙ্গুল দেওয়া নয়৷

আমি আমার পায়ুপথকে খুব ভালবাসি, গুড়াকৃমি কুটকুট করলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে খোঁচাখুঁচি করে আরাম পাই, তাতে রাণী ভিক্টোরিয়ার সমস্যা কি? আর সমাজের মানুষেরই এত আগ্রহ ও কৌতুহল কেন? আমার পায়ুপথে আমি যা খুশি ঢোকাবো তাতে কার কি? আমার পায়ুপথের মধ্যে কি “প্রকৃতি”-র প্রাণ যে একটু আঙ্গুল ঢুকালেই “প্রকৃতি” ধ্বংস হয়ে যাবে? কিংবা মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমার বন্ধু তার স্ত্রীর যোনীপথে সঙ্গম না করে মুখমেহন ও পায়ুমেহন করতে ইচ্ছুক এবং এ ব্যাপারে তার স্ত্রীও সম্মতি জানাচ্ছে৷ তাতে আপনাদের এত চুলকায় কেন? চুলকালে মলম লাগান অথবা এ্যান্টিহিস্টামিন খান, আশাকরি নিজেও ভাল থাকতে পারবেন এবং অন্যকেও একটু শান্তিতে বাঁচতে সুযোগ দিতে পারবেন৷ ধন্যবাদ!





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি