এক ব্রাত্যজনের ইষ্টিপত্র
অনিন্দ্য অ্যাঞ্জেল

আজ রোজ মঙ্গলবার, ১০ই অক্টোবর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ!

তোমাদের এখন সুখের দিন, তোমরা আনন্দ করো৷ আমার প্রয়োজনীয়তা শেষ, তাই বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে৷ দূর থেকে কানে ভেসে আসছে; “বল হরি, হরি বোল; বল হরি, হরি বোল”৷ ফরিদপুরের বদরপুর ব্যাপ্টিষ্ট মিশনে আমার দ্বিতীয় মা আছে৷

মাকে কতদিন দেখি না! মা মানে আমার মাসি, নামঃ সুন্দরী মাসি, প্রকৃত নামঃ সুন্দরী বাড়ৈ৷ আমার দ্বিতীয় মা৷ আধ্যাত্মিক সভায় বা স্মরণসভায় মা গাইতেনঃ ““ওপার হতে যাঁরা ভবে এসেছিল তাঁরা, চলে গেল যে যাঁর দেশে৷ ও আমি একা বসে আছি ঘাটে৷৷” হ্যাঁ, মাসি আমার বাঙ্গালী খ্রীষ্টান ব্যাপ্টিস্ট৷ জাতিতে চিকেরী৷ চিকেরী জাতি, হিন্দু দলিত সম্প্রদায়৷ অস্পৃশ্য বর্ণের নাম৷ মাসির ঠাকুরদা খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন৷ মাসির বড় দাদা একটা সুন্নী মুসলিমকে ভালোবাসতো বলে পরে মুসলমান হয়ে যায়৷ মাসি ফরিদপুরে বসে গান গাইছেন, আমি খুলনায় বসে শুনছি৷ মাসি আমার মধ্যে তার মৃত ছেলে টনিকে খুঁজে পান৷ টনিকে প্রতিবেশীরা শত্রুতা করে পুকুরে ডুবিয়ে মেরে ফেলেছিল৷ ছোট্ট টনি অনেক কষ্ট করে মরে গেছে৷ মাসি পাগল হয়ে গেছিল৷ এখন অবশ্য বেশ ভাল, বড় ছেলে জনিও সবসময় টনির কথা মনে করে মন খারাপ করে থাকে৷ আমার মাঝে মাসি, মেসো, জনি, সবাই তাঁদের হারানো টনিকে খুঁজে পেয়েছেন৷ আজ মাসিকে খুব মনে পড়ছে৷ আমি তো রোবট নই! বড়দিন চলে যাচ্ছে৷ গীর্জা থেকে ভেসে আসছে; “উড়াও বিজয় পতাকা …….”৷ ধূপের গন্ধ, আগরবাতির ঘ্রাণ, ফুল-চন্দন, বেদীতে সাজানো রয়েছে৷ তবুও যীশুর ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত বক্ষ দেখে আনন্দ আসে না মনে৷ গত জন্মে আমি মাসির সন্তান ছিলাম হয়তো৷ আমিও চিকেরী ছিলাম৷ শিয়া মুসলিমদের যেমন সুন্নীরা ঘৃণা করে, তেমনি চিকেরীদেরকেও অন্যান্য হিন্দুরা ঘৃণা করে৷

শিয়া মসজিদের কথা মনে পড়ে গেল৷ খালিশপুরের শিয়া মসজিদের নাম হোসাইনী মিশন এবং আবাসিক থিওলজিক্যাল সেমিনারী ও মাদ্রাসার নাম হাওযা-এ-ইলমিয়্যাহ-এ-সাহেবুজ্জান৷ আর আলতাপোল লেনের শিয়া মসজিদের নাম আঞ্জুমানে পাঞ্জাতানী৷ এসব মসজিদের হুজ্জাতুল ইসলাম বা বড় মৌলভীগণ খুব হৃদয়স্পর্শীভাবে নওহা পড়েন, মাতম করেন, মার্সিয়া গান, সৌজ গান, রওজাখানী করেন, মাজলিশ পড়েন, আজাদারী করেন৷ শীয়া মসজিদ থেকে ভেসে আসছে নওহা; “ইন্নাল্লাহ মা সাবেরীন, ইন্নাল্লাহ মা সাবেরীন …….”

বিবি জয়নাব হুসাইনকে বলছেন; “শারপে আগার সাহরা সাজানা, ভাইয়া মুঝে ভুল না জানা”

“ইয়া আলী মাওলা, হায়দার মাওলা”৷ “ইয়া সাইয়্যেদি ইয়া আব্বাস”৷
“গাজী আলাম তেরা উঁচা রাহে গা………”

“ফোরাতের পানিতে নেমে ফাতেমার দুলাল কাঁদে……”

একদিন হঠাৎ শুনি, আমার এক প্রিয় বাহা’ই বন্ধু মুজাহিদ মারা গেছে৷ কেউ কেউ বলছে সে আত্মহত্যা করেছে৷ কেউ কেউ বলছে তার সৎ মা তাকে মেরে ফেলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছে৷ খুব ভাল ইংরেজী পারতো মুজাহিদ৷ মুজাহিদ আর আমার যৌথভাবে একটা ইংরেজী শিক্ষার ক্লাব ছিল৷ ওর মৃত্যুর পর খালিশপুরস্থ খুলনা বাহা’ই সেন্টারে স্মরণসভায় গেলাম৷ বাহা’ই সেন্টারে মৃতদের জন্য প্রার্থণা হচ্ছে; “তাঁদের দোষ তুমি মুক্ত করো, দুঃখ দূর করো, হে আমার প্রভু, হে আমার প্রভু৷ তাঁদের অন্ধকার আলোকে পরিণত করো, তাঁদের অন্ধকার আলোকে পরিণত কর৷ সর্বোচ্চ গিরি শিখরে, তোমার প্রভা তাঁদের দেখতে দাও, হে আমার প্রভু৷ পরম পবিত্র বারিধারায় তাঁদের তুমি নির্মল করো, পরম পবিত্র বারিধারায়, তাঁদের তুমি নির্মল করো, তাঁদের আনন্দোদ্যানে প্রবেশ করতে দাও, হে আমার প্রভু, হে আমার প্রভু৷ তাঁদের দোষ তুমি মুক্ত করো, দুঃখ দূর করো, হে আমার প্রভু, হে আমার প্রভু, হে আমার প্রভু!” ইয়া বাহাউল আবহা!!

অনেকদিন হয়ে গেল, মুজাহিদের কবরে দূর্ব্বাঘাস গজিয়েছে হয়তো, কয়জন তাকে মনে রেখেছে? অনেকদিন পর আজকে সন্ধ্যায় একটু শখ করে লেমনগ্রাস, আদা আর লেবু দিয়ে চা খাচ্ছি! গোধূলী লগ্ন পেরিয়ে সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে৷ সেন্ট মেরী’স ক্যাথোলিক চার্চ থেকে দূর থেকে ঘন্টা ধ্বনি ভেসে আসছে৷ ঢং ঢং ঢং৷ মনে পড়ে গেল ক্যাথোলিক প্রার্থনাঃ “প্রণাম মারিয়া…..”৷ নিজের অজান্তেই ক্রুশচিহ্ন আঁকলাম, পিতা, পুত্র, পবিত্র আত্মার নামে, আমেন!

সন্ধ্যা দিচ্ছে প্রতিবেশী হিন্দু রমনীরা, উলু দিচ্ছে আর শঙ্খ ধ্বনি বাজাচ্ছে৷ মসজিদ থেকে আযান ভেসে আসছে৷ “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার……”

ভৈরব কুলে নিস্তব্ধতা নেমে আসছে৷ সূর্য ডুবে গেছে৷ হাসনাহেনারা মাতালকরা ঘ্রাণ ছড়াতে শুরু করেছে৷ হালকা হালকা শিশির ঝরা শুরু করেছে৷ বিলাসিয়া উঠোনে ছুঁচোকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে৷ বিলাসিয়া শুধু আমার বিড়াল নয়৷ আমার সন্তান!

লাল আভা এখনও আছে পশ্চিম আকাশ জুড়ে৷ হঠাৎ নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভেদ করে একদল লোক একটা খাটিয়ায় লাশ নিয়ে যাচ্ছে আর কালিমা পড়ছে “আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”!

আমার বাড়ির সামনে কোন দেওয়াল নেই, তাই সব দেখতে পেলাম৷ মাগরিবের নামাজের পর জানাজা হবে৷ তারপর চলে যাবে মাটির তলে৷

আর ভৈরবের অন্য তীরে চরেরহাট মহাশ্মশান হতে ভেসে আসছে একটা প্রতিধ্বনি; ‘‘ বলো হরি, হরি বোল, বলো হরি, হরি বোল”! শীতকালে শব্দগুলো মনে হয় অনেক দূর দূরান্ত থেকেও শোনা যায়৷

ফাদার জন ভস্ম বুধবারের প্রার্থণায় বলেছিলেন; “ হে মনুষ্য, তুমি ধূলি হইতে আগত, ধূলিতেই প্রত্যাগমন করিবে; পিতা, পুত্র, পবিত্র আত্মার নামে; আমেন!” ফাদার জন সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় পাঁচ বছর হলো৷ কিন্তু কথাগুলো এখনও কানে ভেসে আসছে৷

ওদিকে এসব ভাবতে ভাবতে আমার চা ঠান্ডা হয়ে গেল৷ ঠিক যেমন আমার নানী মরে যাওয়ার সময় তার দেহ ঠান্ডা নিথর হয়ে গেছিল! তাহলে নানীর দেহ আর চায়ের কাপের মধ্যে পার্থক্য কি?? ভগবান গৌতম বুদ্ধ বলেছেন যে এই দেহ একটি পরিচ্ছদ মাত্র, মৃত্যুর পর এটি মূল্যহীন!!

আজকে আমি এই মুহূর্তে মারা গেলে আমার প্রিয়জনেরা বলবে “লাশের সৎকার করো”৷ আমার বয়ফ্রেন্ড, আমার দেহ স্পর্শ করবে না, ঘৃণা করবে৷ অথচ, গতরাতেই আমার দেহটাকে সে উপভোগ করেছিল!

আমার একটা শেষ ইচ্ছে আছে৷ আমার মৃত্যুর পর আমাকে ভৈরব নদের কূলে দাহ করবে৷ আমি উইল লিখে যাবো, চোখ দুটো, দান করে যাবো খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে৷ যদিও হানাফী মাজহাবভূক্ত সুন্নী মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম তবুও আমাকে ভৈরব নদের তীরে সনাতন হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী আমাকে দাহ করবে তোমরা৷ আমার লাশের উপর রংধনু পতাকাটা একটি বার হলেও বিছিয়ে দিও৷ পরে দরকার হলে হুইল সাবান দিয়ে ধূয়ে নিও যদি ঘেন্না লাগে৷ আমি চল্লিশ হাজার টাকা জমিয়ে রেখে যাবো৷ শিরিশ কাঠ, চাম্বল কাঠ, খড় আর পেট্রোল দিয়ে আমাকে পোড়াবে৷ ঘির দরকার নেই৷ ঘি-এর অনেক দাম! চন্দন কাঠেরও দরকার নেই, সেটিও বহুমূল্য৷ ঠাকুর মশায়কে দক্ষিণা দিতে হবে না? পুড়ানোর পর দেহ ভস্ম ভৈরব নদে ফেলে দিও! শ্রাদ্ধের সময় প্রার্থণা করবে যেন আগামী জন্মে আমি হয় “বিষমকামী প্রকৃত পুরুষ” হয়ে নরওয়ের একটি ধনী ঘরে জন্মাতে পারি, নতুবা শালিক পাখি হিসাবে জন্মাতে পারি!





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি