দু’টি নক্ষত্রের খোঁজে - তনয়
অনিন্দ্য অ্যাঞ্জেল



মানুষ যখন নানা ধরণের সামাজিক চাপের মধ্যে পড়ে যায় এবং সেগুলো থেকে উত্তরণেরপথ খুঁজে পায় না; যখন প্রতিনিয়ত নিজের সত্তাকে লুকিয়ে রেখে চারপাশের মানুষগুলোর সাথে নিখুঁতভাবে অভিনয় করে চলতে হয়; তখন মানুষ একটু আশার আলো দেখতে চায়,একটু আশ্রয় খুঁজতে চায়, ঠিক যখন কোন সাঁতার না জানা মানুষ পানিতে হাবুডুবু খায়,আর কি কচুরিপানা কি শেওলা যা পায় তাই ধরে বাঁচার চেষ্টা করে, একটু অবলম্বন, একটু ঠাঁই, একটু স্বান্তনা পেতে চায়, সেরকমভাবে৷ আমার জীবনেও অনেক ঝড়-ঝাপটা এসেছে৷ আমার দুর্যোগের মুহুর্তগুলোতেও আমিও ঠিক সেরকম একটা অবলম্বন খুঁজেছি৷ সে অবলম্বন আর্থ-সামাজিক নয়, কিন্তু মানসিক৷ নিদেনপক্ষে একটি “পরিবার” খুঁজেছিলাম, যারা আমার দুঃখ-কষ্টগুলো সহভাগীতা করে নিতে পারবে এমন একটি “পরিবার”৷

যাহোক,অনেক বছর পর একজন ভাল বন্ধুর মাধ্যমে জুলহাজ মান্নান ভাইয়া এবং তাঁর পরিবার“রূপবান”-এর খোঁজ পাই৷ জুলহাজ ভাই মানুষটাকে প্রথম যখন দেখেছিলাম, তখন তিনি আমাদের শহরে আমাদের সংঘ “ভিভিড রেইনবো” কর্তৃক আয়োজিত “রসের বন্ধু” নামক একটি পার্টিতে, যেটি ছিল দক্ষিনবঙ্গের সবচেয়ে বড় সমপ্রেমী মিলনমেলা, ২০১৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর৷ প্রথমবার যখন তাঁকে দেখি তখনও বুঝে উঠতে পারিনি যে, তিনি যাদু জানেন৷ মিতভাষী এবং মিষ্টভাষী, অমায়িক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি৷ অসম্ভব রকমের সাদামাটা, ভদ্র-মার্জিত, রুচিশীল এবং নিয়মানুবর্তী ছিলেন জুলহাজ ভাই৷ দ্বিতীয়বার যখন তাঁকে দেখি, সেটা ছিল ২০১৫ সালের প্রথম দিকে, “প্রথম রূপবান ইয়ুথলিডারশীপ ট্রেনিং প্রোগ্রাম”-এ৷ আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাবতাম যে, হয়তো ঢাকার লোকেরা মফস্বলের লোকদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে না৷ কিন্তু আমার সে ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করলেন জুলহাজ ভাই৷

তিনি তাঁর বাসায় আমাকে এবং ইয়ুথ লিডারশীপ প্রোগ্রামে দূর হতে আগত অন্যান্য বন্ধুদেরকে থাকার ব্যবস্থা করলেন৷ রাতে শোয়ার সময় আমাদেরকে বিছানায় এবং নিজে মেঝেতে শোবেন বলে স্থির করলেন৷ যেহেতু ছোট্ট এ্যাপার্টমেন্ট আর আমরা বেশ কয়েকজন, তাই আমরাই এক প্রকার জোর করে তাঁকে বিছানায় শোয়ালাম আর আমরা ফ্লোরিং করলাম৷ কিন্তু ঐ রাতে জুলহাজ ভাই মোটেও ঘুমাতে পারলেন না আমাদের গল্প গুজব আর বকবকানির জ্বালায়৷ কিন্তু তিনি এত ধৈর্য্যশীল তা বুঝলাম ঐ রাতে, একটুও বিরক্তি প্রকাশ করলেন না তিনি৷ পরের দিন সকালে আমরা বাইরে নাস্তা করলাম৷ এরপরে তাঁর সাথে কিছুটা কথা বলার সুযোগ হলো৷ তাঁর ভিতরে কোন প্রকার দেমাগ, অহংকার, হিংসা, জটিলতা কিংবা প্রতিযোগীতামূলক মনোভাবের কোন চিহ্নই দেখতে পেলাম না৷ তাঁর ব্যক্তিত্বের যাদুর পরশ পড়তে লাগলো আমার উপর৷ তিনি খুব সহজেই মানুষকে তাঁর আন্তরিকতা দিয়ে কাছে টেনে নিতে জানতেন৷ ঐ সময় তনয় ভাইয়ের সাথেও দেখা হয় প্রথমবারের মত৷ তনয় ভাইকে প্রথম দেখলে মনে হতো তিনি খুব গম্ভীর৷ কিন্তু তিনিও অসম্ভব আন্তরিক এবং গুণী মানুষ৷

জুলহাজ ভাই কখনই তাঁর প্রশংসা করা পছন্দ করতেন না৷ জুলহাজ ভাই এবং অন্যান্য বন্ধুরা ঠিক তাঁদের সমমনা মানুষদেরকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন “টীম রূপবান”, যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নানা উদ্যোগে শামিল হতেন৷ “টীম রুপবান”-এর প্রায় সবাই একেকটিবিশেষ বিশেষ দিকে দক্ষ ছিলেন৷ তাই জুলহাজ ভাই কখনই পছন্দ করতেন না যেলোকেরা শুধু তাঁকেই প্রশংসা করুক কিংবা বাহবা দিক৷ তিনি যা করেছেন, তা আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে এবং ভালবাসার অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে, কোন প্রকার বাহবা কুড়াবার কিংবা সেলিব্রেটি হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়৷ “রূপঙক্তি”নামক কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের পূর্বে তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন৷ আমাকে একটা কবিতা লিখতে বললেন৷ আমি তো কখনই কবিতা লিখিনি, আর পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোন কবিতা কখনই পড়িওনি৷ তাহলে কিভাবে কবিতা লিখব? জুলহাজ ভাইকে আমি“দাদাভাই” সম্বোধন করতাম৷ দাদাভাই আমাকে অনুপ্রাণিত করে বললেন; “আপনি অবশ্যই লিখতে পারবেন৷ চেষ্টা করতে দোষ কি? আমরা কেউই সে অর্থে কবি-সাহিত্যিক নই,কিন্তু আমরা আমাদের মনের কথাগুলোই লিখতে পারি৷ একদম নিখুঁত কিংবা নির্ভুল হতে হবে না, মনে যা আসবে তাই লিখবেন, ছন্দও মেলানো লাগবে না৷” তাঁর অনুপ্রেরণায় কবিতা লিখলাম “শিখন্ডীর অনুযোগ”; মনের সব আবেগ অনুভূতি উজাড় করে৷

“টীম রূপবান” থেকে জানানো হলো যে আমার কবিতাটা “রূপঙক্তি”-তে ছাপানোর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে৷ আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না! পরে তনয় ভাই আমার সাথে যোগাযোগ করেন কবিতাটির আবৃত্তি সম্পর্কে৷ এত সুন্দরভাবে কবিতাটি আবৃত্তি করলেন তনয় ভাই যেন মরা কঙ্কালের উপর মাংস এবং চর্ম দিয়ে সাজালেন! তিনি সেই আবৃত্তির রেকর্ডিং পাঠালেন হোয়াটসএ্যাপের মাধ্যমে৷ পরবর্তীতে সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ই.এম. কে. সেন্টারে সে কবিতার আবৃত্তি করেছিলেন তনয় ভাই তাঁর জন্মগতভাবে পাওয়া অভিনয় প্রতিভার মাধ্যমে৷ সেখানে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত শিখন্ডীর প্রতিচ্ছবি!কবিতাটির চরিত্রটিকে তিনি জীবন্ত এবং বাস্তবের ছোঁয়ায় প্রতিফলিত করে ভূয়সী প্রশংসার অধিকারী হয়েছিলেন৷ কাজের ব্যস্ততার কারণে ঐ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি বটে তবে তনয় ভাইয়ের অডিও রেকর্ডিংটা আমি এখনও শুনি৷ মনে হয় তনয় ভাই পাশেই রয়েছেন! এত সুন্দর, এত প্রাঞ্জল হয়েছিল সে রেকর্ডিং যে এখনও যদি সেটা শুনি তো আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে!

আমি মাঝে মাঝেই সেটা শুনি আর মুগ্ধ হই তাঁর সৃজনশীল অভিনয় প্রতিভার কথা চিন্তা করে৷ তাঁর একই অঙ্গে ছিল বহুরূপ, তিনি যেকোন চরিত্রের গভীরে ঢুকে নিজেকে সেভাবেই প্রতিফলিত করতে পারতেন৷ কিভাবে এরকম সৃজনশীল প্রতিভাবান লোকগুলি আমাদের মাঝ থেকে অকালে চলে যেতে পারলেন?সেসব কথা ভাবি আর এই অন্ধকার সমাজের প্রতি ধিক্কার দেই! শেষবার জুলহাজ ভাই এবং তনয় ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয় গত মার্চ মাসে “দ্বিতীয় রূপবান ইয়ুথ লিডারশীপ প্রোগ্রাম”-এ৷ জুলহাজ ভাই এবং তনয় ভাই তাঁরা দু’জনেই বলেছিলেন যে আমি নাকি আগের চেয়ে “মেন্টালি ম্যাচিউর্ড” এবং “সফিসটিকেটেড” হয়েছি৷ জুলহাজ ভাইয়ের একটি কথা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল৷ সেটি ছিল; “শিক্ষা, শিক্ষা, এবং একমাত্র শিক্ষাই আপনাকে স্বাধীন এবং স্বাবলম্বী করতে পারে৷ আর আপনি পারবেন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে ভেঙ্গে ফেলতে৷”

জুলহাজ ভাই এবং তনয় ভাই আমার ভিতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন এবং আমার নিজের ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে সহযোগীতা করেছিলেন৷ তাঁরা ছিলেন পরশ পাথর৷ তাঁরা আমার মত অনেক সুপ্ত খনির গুপ্ত মনি-মানিক্য আহরণ করে এনেছিলেন৷ যেমন, মহান বাহা’উল্লাহ বলেছেন; “প্রতিটি মানুষকে অমূল্য রত্নের খনিস্বরূপ বিবেচনা করবে৷” কেননা, প্রতিটি মানুষই অফুরন্ত সম্ভাবনারঅধিকারী৷ সেই বিষয়টি “টীম রূপবান” বুঝতে পেরে সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছিল৷আমি তাঁদের কাছ থেকে যেমন অনুপ্রেরণা পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি আত্মবিশ্বাস৷ পেয়েছি আন্তরিকতা, পেয়েছি স্নেহময় শাসন৷ জুলহাজ ভাইয়ের মমতাপূর্ণ স্নেহের কারণে অনেকেই তাঁকে “খালা” বলে ডাকতো, আর আমি ডাকতাম “দাদাভাই”৷ আজকে দাদাভাইরা আর এই মর্ত্যলোকে নেই ঠিকই কিন্তু তাঁদের অবদান আমরা সবসময় মনে রাখবো৷ তাঁদের স্মৃতি চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে আমাদের মাঝে৷ প্রয়াত জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বী তনয় ছিলেন সেই দু’টি নক্ষত্রের নাম, যাঁদের পরশে এই বাংলার আকাশ রঙধনু রঙে রাঙা হয়েছিল৷ তাঁরা চিরকাল আমাদের গগনে দীপ্তিমান থাকবেন! আমরা তাঁদেরকে ভুলবো না!





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি