বিহঙ্গ
শেখ মোঃ মমিনুল ইসলাম

প্রিয় তনয়দা,

আজ একটি বছর হলো তুমি মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়ে গিয়েছো সেই সুদূর দিগন্তে। এ এমন এক অচিনপুর যেখানে গেলে হয়তো আর ফিরে আসা যায় না। কিংবা হয়তো ফিরে আসা যায়? কে জানে? সে সব প্রশ্নের উত্তর জানিনে। শুধু জানি তোমাকে আর দেখতে পাবো না পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায়, রঙধনু যাত্রায় কিংবা “সোনাই মাধব” চরিত্রে বেইলী রোডের থিয়েটারপাড়ায়। আজ তুমি নেই, তোমার (তথাকথিত) অনেক বন্ধু তোমার নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটছে। কেউ কেউ তোমাকে যে চিনতো সে কথাই অস্বীকার করছে তুমি “সমকামী” কিংবা “প্যানসেক্সুয়াল বা নিখিলকামী” বলে। এসব শব্দ নাকি তাদের ঘেন্না লাগে, মুখে উচ্চারন করতে লজ্জা লাগে, এসব নাকি অশ্লীল শব্দ, আর তুমি নাকি দুশ্চরিত্র! তোমার অনেক সহকর্মী তোমার বিষয়ে কথা বলতে চায় না। এতে নাকি তাদের ক্যারিয়ারে ধ্বস নেমে আসবে। তোমাকে পরিচয় দিলে তাদের নাকি মানসম্মান সব ডুবে যাবে, সমাজের মানুষের সামনে নাকি তাদের চেহারা দেখাবার আর উপায় থাকবে না। তাদের মুখে নাকি চুনকালি লেপটে যাবে।

তুমি নাকি “নাস্তিক”? সমকামীরা নাকি “নাস্তিক” এবং “দুশ্চরিত্র”? সংস্কৃতিকর্মীরা নাকি “নাস্তিক” এবং “দুশ্চরিত্র”? সকল সংস্কৃতিকর্মীই নাকি সমকামী এবং শাহবাগী? যারা শাহবাগে যায় তারা নাকি “নাস্তিক” এবং “দুশ্চরিত্র”?? তাদেরকে মেরে ফেলা নাকি জায়েজ?? তাই তোমার মৃত্যুবার্ষিকীতে কিছু লোক আনন্দ করার পরিকল্পনা করছে। নিদেন পক্ষে, তোমার নামের সাথে “নাস্তিক” তকমা এঁটে দিয়ে তোমার মৃত্যুকে আনন্দের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে অনেক উগ্রবাদী এবং কিছু তথাকথিত “মডারেট” (মধ্যমপন্থি) বকধার্মিক লোকেরা ফেসবুক সহ নানা সামাজিক মাধ্যমে তোমাকে পঁচিয়ে নানান মুখরোচক পোস্ট দেবে। আর তোমার হত্যাকে “হালাল” বলে ফতওয়া দেবে। আর আমাদের হুজুগে বাঙ্গালী সমাজ সেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নানা গল্পগুজবে বিশ্বাস করবে। আমাদের বেহায়া রাজনীতিবিদরা এবং অন্ধ রাষ্ট্র জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে, গণতন্ত্রের নামে কিংবা আইনী জটিলতার দোহাই দিয়ে সেই হত্যার বিচার করবে না। তুমি তো আর সালমান শাহের মত সেলিব্রেটি নও, হত্যার বিচার করবেই বা কেন? সালমান শাহ-এর মৃত্যু রহস্যও কিন্তু উদ্ঘাটিত হয়নি। রাজনীতিবিদদের ভাষ্যমতে; “এরকম দু’-পাঁচটা মরলে মরুক, তাতে কি? সেলিব্রেটি তো আর নয়; ভক্তের সংখ্যা যদি ১ কোটি হতো, তাহলে না হয় মিডিয়ার সামনে কালোব্যাজ পরে শোক জানাতাম’’। আমি বলতে চাই; “মন্ত্রী মহাশয়, ঈশ্বর না করুন, আগামীকাল হয়তো আপনার প্রিয় সন্তানটিকেও জঙ্গীরা হত্যা করলো; তখনও কি আপনি শোক জানাবেন না??”

সে যাকগে, গত ১ বছরে কত কিছু যে ঘটেছে তুমি জানো না। আবার হয়তো জানো। তোমার মৃতদেহের ছবি দেখিয়ে অনেকেই রাজনৈতিক আশ্রয় (যাকে নাকি “অ্যাসাইলাম” বলা হয়) নিয়ে পাশ্চাত্যে পাড়ি জমিয়েছে। অনেকেই আবার দাবি করছে যে তারাই নাকি “রূপবান”এর নির্বাহী পরিচালক কিংবা সম্পাদক ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে দেখেছো, তোমার রক্ত নিয়ে শুধু উগ্রবাদীরাই হোলি খেলেনি, কিন্তু তোমার বা তোমাদের অনেক তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীরাও তোমাদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলেছে/খেলে/খেলছে কিংবা খেলবে। কিন্তু আমি জানি পদমর্যাদার লোভ কখনই তোমার এবং তোমাদের ছিল না। তুমি ছিলে “মুক্ত”, “মুক্তমনা”। আর তাই তো আজ উড়ে গেলে মুক্তবিহঙ্গের মত সবকিছু ছেড়ে। কোন্ ফ্লাইটে, কোন্ এয়ারলাইন্সে টিকিট কাটলে তোমার সেই অচিনপুরে যেতে পারব, বলতে পারবে? বলবে বলে ফোন নম্বর দিয়েছিলে, কথাও বলেছিলে, কিন্তু কই সেই ঠিকানা বলে গেলে না যে?? তবে ভেবো না, আমার ভিসা এসে গেলে আমিও পাড়ি জমাবো তোমার সেই অচিনপুরে, পাসপোর্ট প্রস্তুতই আছে, শুধু সিল পড়লেই ফুড়ুৎ করে উড়াল দেবো সময়মত!

সত্যি তুমি নির্বাণ লাভ করেছো, মোক্ষ লাভ করেছো, পরিত্রাণ লাভ করেছো, নাজাত লাভ করেছো। যারা তোমাকে “নাস্তিক” উপাধি দেয়, তাদের বলে দিও “আনাল হ্বক্ক”!

আজ দু’দিন বেশ বৃষ্টি হল জানো? যেন আকাশ অনেক কাঁদল! ভৈরবকুলে আজ বিকেলে রংধনুতে তোমাকে আর জুলহাজ ভাইকে খুঁজে পেলাম। তোমাদের চেহারাও রংধনুর মতই সাতরঙা হয়ে গেছে। অনেক আনন্দে আছো না? আমাদের একলা ফেলে?

এমনি ভাবেই চিরদিন রংধনুর সাতরঙের মাঝেই থেকো। বৃষ্টি শেষে একটু উঁকি দিয়ে যেও, আর নিচে আমাদের দিকে একটু তাকিয়ে যেও, ঢেলে দিও আশীষ-বারি!!

ইতি,

তোমার একজন প্রতিবাদী ভক্ত।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি