সাতরঙা ভালোবাসা
নীল দর্পন

– নিতু…
– হু বল।
– সত্যিই ভালোবাসো তো?
– হু বাসি।

ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুঁটে উঠে সাজ্জাদের। যেন আশ্বস্ত হয়। দু হাতে জড়িয়ে ধরে আরেকটু কাছে টেনে আনে মেয়েটাকে। চোখ বুঁজে ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। সাজ্জাদের বাহুডোরে দম বন্ধ হয়ে আসে নিতুর। তিক্ত অনুভূতিটাকে ঠেলে দূরে সরাতে চায়। নিজেকে প্রতারক মনে হয়।

সাজ্জাদ ছেলেটা নিতান্ত ভালোমানুষ। সুপুরুষ। ভালো চাকরি করছে। সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। নিতুকে মনে প্রাণে ভালোবাসে। ভদ্র, বিনয়ী, নিরহংকারী ছেলেটাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোন কারণ পান নি নিতুর বাবা মা। মেয়ের পছন্দকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। সামনেই নিতুর সেমিস্টার ফাইনাল। অনার্সটা কমপ্লিট হলেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলা হবে। এঙ্গেজমেন্ট হয়ে গেছে আরো আগে। এখন শুধু নিতুর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পালা।

“কিরে? খবর কী?

ডাক শুনে আর কাঁধে হালকা ছোঁয়া পেয়ে ঘুরে তাকায় নিতু। জারিন দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। হঠাৎ ভেতরটা কেমন যেন করে উঠে ওর।

“এইতো চলে”

জারিন এখনো কাঁধ থেকে হাত নামায় নি। মনেপ্রাণে চাচ্ছে এই হাত যেন না নামে কোনদিন। মেয়েটা স্বভাবসুলভ বকবক করেই যাচ্ছে। কী বলছে বেশিরভাগ কথাই কানে ঢুকছে না নিতুর। জারিন মেয়েটা কথা বলার ভঙ্গিটা সুন্দর। সাবলীল। তবে খুব দ্রুত বলে। যেন মাথার উপর দিয়ে এক ঝাঁক রঙিন প্রজাপতি হুড়মুড় করে উড়ে গেল। কথা বলতে বলতে জিভ দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে নেয় বারবার। এটা ওর অভ্যাস। এই দৃশ্যটা নিতুর খুব প্রিয়। ভেজা ঠোঁটজোড়া ভোরের শিশিরসিক্ত সদ্য ফোঁটা গোলাপের মত মনে হয়। আলতো করে ছুঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছাটা খুব কষ্টে দমন করে। জারিন চলে যাচ্ছে। বুকের ভেতটা কেমন মুচড়ে উঠে নিতুর। আর কিছুক্ষণ থাকলে কী এমন ক্ষতি হত?

বাসটা জ্যামে আটকে আছে অনেক্ষণ। গোটা বাসটা যেন একটা জ্বলন্ত উনুন। ভেতরের মানুষগুলোকে ভাপে সেদ্ধ করা হচ্ছে। সাজ্জাদের ফর্সা মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। চোখে মুখে ক্লান্তি। সারা সপ্তাহ অফিস করে মানুষটা। বাবা- মা আর ছোটবোনের সংসারের দায়িত্বটা যে ওরই। নিতুর মায়া লাগে। এই মায়াটাই একসময় প্রেম বলে ভ্রম হয়েছিল। তার সেই ভ্রমের মাশুল গুনতে যাচ্ছে মানুষটা। নিতু খুব ভালো করেই জানে ছেলেটাকে কখনোই ভালোবাসতে পারবে না ও। মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করে যেতে হবে সারাটা জীবন। গা গোলানো সঙ্গম শেষে তৃপ্তির হাসি হাসতে হবে। নিজেকে দোষারোপ করতে গিয়েও পারে না। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ও। সংস্কার আর তথাকথিত মানসম্মানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর একজন হয়ে কী করে জানবে ওর বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ভালোবাসা একজন সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি? জারিনের প্রেমে না পড়লে হয়ত ভ্রমটাকেই সত্যি বলে জেনে যেত সারা জীবন। সেটাই বরং ভালো হত। নিতুর হাতে হাত রাখে সাজ্জাদ। হাতটা টেনে সরিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় নিতু। আর কিছুটা অবাক হয়ে নিতুর দিকে তাকিয়ে থাকে সাজ্জাদ। মেয়েটাকে ইদানিং বুঝতে পারে না ও।

জারিন সকালেই বইখাতা নিয়ে নিতুর বাসায় চলে এসেছে। বিনা নোটিশে। উদ্দেশ্য- গ্রুপস্টাডি। জারিন মেয়েটা পাগলা কিসিমের। ওর পাগলামিটাও বেশ ভালো লাগে নিতুর। উদ্দেশ্য গ্রুপ স্টাডি হলেও স্টাডিটা যে শুধু জারিনেরই হতে যাচ্ছে এবং তার স্টাডি যে মাথায় উঠতে যাচ্ছে এটা বেশ বুঝতে পারে ও। প্রমাণও পায় হাতেনাতে। ভরদুপুরে জারিন যখন হাত- পা- মাথা নেড়ে ক্রমাগত পড়ে যাচ্ছে তখন নিতু শুধুই নোটের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে। ফ্যানের বাতাসে উড়তে থাকা জারিনের অবাধ্য চুলগুলোতে মুখ ডুবিয়ে খুব একচোট কাঁদতে ইচ্ছে হয় ওর। ওর তাকিয়ে থাকার ধরণ দেখে পড়া থামিয়ে অবাক চোখে জারিনও তাকায় ওর দিকে। হঠাৎ কী হয়ে যায় ওর ভেতর ও বুঝতে পারে না। কোন এক অদৃশ্য শক্তি ওকে টেনে নিয়ে যায় মেয়েটার কাছে…. আরো কাছে। উপচে পড়া আবেগটা এবার আর নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টা করে না নিতু। যেন শুষে নেবে গোলাপের পাঁপড়িতে জমে থাকা শেষ শিশিরবিন্দুটাও। জারিনও বাঁধা দেয় না। শরীর পেতে নিবেদিত সমস্ত প্রেমকে নিজের করে নেয়।

হঠাৎ বিয়ে পেছানোর জন্য কেমন গোঁ ধরেছে নিতু। বলছে এখনো নাকি সে বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। সময় লাগবে। এমন উদ্ভট দাবির কোন মাথামুন্ডু খুঁজে পায় না কেউ। না সাজ্জাদ, না নিতুর বাবা মা। তবে শেষমেশ নিতুরই জয় হয়। বিয়েটা আরো কিছুদিন পিছিয়ে যায়। অপেক্ষা করতে আপত্তি নেই সাজ্জাদের। কিন্তু কোথায় যেন একটা ভয় হয়। নিতুকে হারাবার ভয় তাকে দিনরাত তটস্থ করে রাখে। তবুও… অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই তার।

পার্কের এদিকটা বেশ নির্জন। দুয়েকটা ফেরিওয়ালা ছেলে হুটহাট চলে আসে যদিও। তবু বাইরের কোলাহল থেকে সহজেই নিজেদের আলাদা করে ফেলতে পারে ওরা দুজন। নিতুর মুঠোর ভেতর জারিনের আঙুলগুলো খেলা করে। নিতুর কোলে মাথা রাখে জারিন। মেয়েটার মুখে রোদ পড়ছে। তাই দু হাত দিয়ে সূর্যটা আড়াল করে দেয়। জবাবে ওর দিকে চেয়ে একবার মুচকি হাসে শুধু। দুজনের কেউই কোন কথা বলে না। নিরবতায় কেটে যায় অনেকগুলো মুহূর্ত। একজোড়া চড়ুই শুধু একটানা কিচিরমিচির করে যাচ্ছে অনেক্ষণ ধরে।

ইঁদুর বিড়াল খেলতে আর ভালো লাগছে না। এবার একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। নিজের জীবন কিংবা পরিবার, দুটোর একটা বেছে নিতেই হবে। সমপ্রেমী হওয়ার অপরাধে পরিবার কখনো তাকে মেনে নেবে না। এ সমাজ যে মেয়ে- জামাই চায়, মেয়ে- বউ নয়। কিন্তু সারাজীবন নিজের সাথে, যার সাথে বিয়ে হবে সেই মানুষটার সাথে, পরিবারের সাথে, প্রেমিকার সাথে প্রতারণা করে যাওয়ার চেয়ে সত্যিটা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা অনেক ভালো।

ফোনের স্ক্রিনে নিতুর নাম দেখে নিজের অজান্তেই হাসি ফোঁটে সাজ্জাদের মুখে। কতদিন পর মেয়েটা তাকে ফোন দিয়েছে।

– হ্যালো।
– কেমন আছো?
– এইতো ভালোই। তুমি?
– হ্যাঁ ভালো…. সাজ্জাদ, তোমার সাথে কথা আছে। কাল একবার দেখা করতে পারবে?

মাথাটা দু হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছে সাজ্জাদ। নিতু মাথা নিচু করে বসে আছে। তবুও সাজ্জাদের দোমড়ানো মোচড়ানো চেহারাটা ঠিক দেখতে পাচ্ছে সে।

– আগে বল নি কেন?
– বুঝতে পারি নি।
– এতদিনের সম্পর্ক পুরোটাই কি মিথ্যে?
– না ভ্রম।
– ও আচ্ছা।
– আমি আসি।

নিতুকে একবারো ফিরে তাকায় না। প্রেম না থাকুক, এতদিনে খুব মায়া পড়ে গেছে ছেলেটার উপর। সাজ্জাদ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কাঁদুক। তবু সারা জীবন প্রতারিত হওয়ার চেয়ে এই কান্না ঢের ভালো।

অন্ধকার নেমে এসেছে। যেখান থেকে এসেছে সেখানে আর ফিরে যাবে না নিতু। নিয়নের আলোয় আলোকিত শহরটা এই মুহূর্তে খুব বেশি আপন মনে হয় ওর। এই শহরের কোন এক গলিতে কোন এক ছোট্ট ফ্ল্যাটে ওর আর জারিনের লাল নীল সংসার হবে। জারিন মেয়েটা খুব অভিমানি। হয়ত কোনদিন ওর আগে বাসায় ফিরে খুব রাগ করে থাকবে। সেদিন বাসায় খালি হাতে ফেরা যাবে না। এক বক্স চকলেট… আর হয়ত একটা গোলাপ! রাগ ভেঙে যাবে মেয়েটার। ভাঙতেই হবে!





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি