অন্যরকম ভালবাসার গল্প
নীল দর্পণ

আমি বরাবরই একটু ম্যানলি। মেয়েলি স্বভাব কখনোই ছিল না আমার। মেয়েদের মত ন্যাকামো, একটু নরম সুরে কথা বলা, ইনিয়ে বিনিয়ে ভাব প্রকাশ, এসব কখনোই ছিল না। আসলে মেয়েদের সাথে সেভাবে মেশা হয় নি কখনো। ছেলেদের সাথে ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল খেলেই বড় হয়েছি। স্বাস্থ্য হ্যাংলা পাতলা হলেও শক্তি, গতি কিংবা ক্ষিপ্রতায় ক্লাসের বেশিরভাগ মেয়েকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলাম। একটা বয়স পর্যন্ত রেগুলার আউটডোর গেমস খেলেছি। এখন সময় আর সুযোগের অভাবে খেলা হয় না। তবে এখনো আমি স্পোর্টস ফ্রিক। সুযোগ পেলেই মাঠে নেমে যাই।

ছোটবেলায় একটা মেয়ের সাথে একধরণের সম্পর্কে জড়িয়ে যাই। তখন আমার বয়স কত ছিল? হয়ত ৫-৬ বা এরকম। তখন তো প্রেম, যৌনতা এসব কিছু বুঝতাম না। টিভিতে নাটক- সিনেমায় যা দেখাতো সেসব দেখে ভেতরে যে কৌতুহল জন্ম নিত সেটা থেকেই এই সম্পর্কের সৃষ্টি। সেই কৌতুহল থেকেই হয়ত চুমু খাওয়া, কিংবা একজন আরেকজনের শরীর স্পর্শ করে দেখা…..। ওখানে যৌনতা ছিল না। ছিল নিছক ছেলেমানুষী আনন্দ।

টিনএইজের শুরুর দিকটায় মানুষের ভেতর একটা ফ্যান্টাসি জন্ম নেয়। ভালোবাসা সম্পর্কে অল্প অল্প জানা। সিস্টেমের দোষেই অনেক ভুলে ভরা সেক্স এডুকেশন। মানুষ তখন নানা ধরণের রঙিন স্বপ্ন দেখা শুরু করে। বিয়ে, সংসার, প্রেম, শরীর…..। প্রকৃতির নিয়মে আমার ভেতরও সেই ফ্যান্টাসি জন্ম নেয়। যে মানুষটাকে ঘিরে জন্ম নেয় সে একটা ছেলে! তখন ভেবেছিলাম প্রেমে পড়েছি। এখন বুঝি ওটা প্রেম ছিল না। ছিল মস্তিষ্কের নিজেকে অন্যদের মত করে তোলার প্রবল চেষ্টা। আমার ফ্যান্টাসিগুলো ছিল অন্যরকম। যখনই এ ধরণের ফ্যান্টাসি কাজ করত আমি নিজেকে ছেলেটার জায়গায় আবিষ্কার করতাম। মানে আমি চাইতাম যে একটা মেয়ের সাথেই আমার বিয়ে হোক। কিন্তু ওই যে বললাম ভুলে ভরা সেক্স এডুকেশন, আমি তখন জানতাম আমার কখনো একটা মেয়ের সাথে বিয়ে হতে পারে না। তাই নিজেকে জোর করেই মেয়েটার জায়গায় বসাতে চাইতাম। কিন্তু তখনই আবিষ্কার করতাম যে আমি আসলে কোন ছেলেকে বিয়ে করতে চাই না। কিন্তু তখন এসব নিয়ে মাথা ঘামাই নি। নিজের উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত কল্পনা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। দীর্ঘ সময় এই প্রসেসটা চলছিল। তারপর কখন ব্রেইন হাল ছেড়ে পুরোপুরি নিউট্রাল হয়ে গেল টেরই পাইনি!

স্কুলের শেষের দিকে আবিষ্কার করলাম আমার সব ফ্রেন্ডেরই বয়ফ্রেন্ড, নিদেনপক্ষে কোন ক্রাশ আছে। শুধু আমারই কেউ নেই। কাউকে ভালোও লাগে না। এসব নিয়ে মাথাও ঘামাতাম না। আমি বসে বসে গালে হাত দিয়ে তাদের প্রেম কাহিনী শুনতাম। এতটুকুই। ততদিনে আমার ছেলেবন্ধুরা গায়েব হয়ে গেছে। আমাদের সমাজের নিয়ম অনুযায়ীই একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর ছেলে- মেয়ের স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেও ভালো চোখে দেখা হয় না। আমার বন্ধুবান্ধব ছিল খুব কম। কারো সাথে মিশতে পারতাম না। হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু ছিল আমার।

স্কুলের শেষের দিকে এবং কলেজে উঠার পর সোশ্যাল ওয়ার্ক, স্কাউটিং এর সাথে যুক্ত হই। যেহেতু এসব সেক্টরে ছেলেদের অংশগ্রহণই বেশি, তাই আমার প্রচুর ছেলে বন্ধু জুটে যায়। আমি খেয়াল করি আমার বন্ধুত্বটা ছেলেদের সাথেই জমে ভালো মেয়েদের তুলনায়। কিন্তু সেটা সেই বন্ধুত্ব পর্যন্তই। এরচেয়ে বেশি কিছু আমি ভাবতে পারি না। তবে এদের মধ্যে কেউ কেউ একটু বেশি এগোতে চেষ্টা করে। আমিও হয়ত কারো কারো ক্ষেত্রে দুই পা সামনে বাড়ি, কিন্তু খেয়াল করি তারপর আর জমে না। বন্ধুত্বের সীমাটা পার হয়ে গেলেই আমি আর তাদের সাথে মিলাতে পারি না। একজন- দুইজন করে অনেকের সাথেই এমন হল। আমি বিষয়টাকে সাধারণভাবেই নিলাম। আসলে সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাও তখন আমার ছিল না। গে, লেসবিয়ান শব্দগুলোর সাথে পরিচিত ছিলাম। অতটুকুই। নিজেকে ওই জায়গাটায় বসিয়ে ভাবি নি কখনো। সমকামিতা সম্পর্কে আমি জানতে শুরু করি একটু একটু করে। আগ্রহ থেকেই জানতে থাকা। খুব বেশি কিছু জানতাম না, তবে বেসিক ধারণাটা হয়ে গিয়েছিল।

একদিন হঠাৎ……। হঠাৎই একটা মেয়েকে দেখে ভালো লেগে যায়। তেমন সিরিয়াস টাইপের ভালোলাগা না। তবে ভালোলাগা। তার প্রতি আমি একধরণের আকর্ষণ বোধ করতে থাকি। যেটা এর আগে আমার কখনো হয় নি। তখন আমি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছি। একটু একটু করে জানছি পৃথিবী। এই ভালোলাগাটা আমার কাছে একটু অন্যরকম মনে হল। ভাবলাম বিষয়টা নিয়ে আরেকটু এডভান্সড পড়াশোনা করা যাক। অনেকের পরামর্শে অভিজিৎ রায়ের সমকামিতা বইটা দিয়ে শুরু করি। তারপর ইন্টারনেট তো আছেই। বিভিন্ন সায়েন্স জার্নাল থেকে শুরু করে পত্রিকার আর্টিকেল এবং ব্লগ পর্যন্ত যা পাই পড়ে ফেলি। নিজেকে সময় দেই, ভাবি। তখনই প্রথম আবিস্কার করি আমি সমলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট। বিষয়টা তখন আমার কাছে স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি ডিপ্রেসড হয়ে পড়ি। তার কারণ নিজেকে লুকিয়ে রাখা, নিজের সম্পর্কে মিথ্যা বলা, সমপ্রেমীদের সম্পর্কে সমাজের মানুষদের কুৎসিত ধারণার কারণে একটা পর্যায়ে নিজেকে অভিশপ্ত মনে হত। অনেক প্রশ্ন জমে ছিল ভেতরে। কাউকে করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। তবে প্রকৃতি আমাকে বেশিদিন এর ভেতর দিয়ে যেতে দেয় নি।

একজন সমপ্রেমী আপুর সাথে পরিচয় ছিল আগে থেকেই। ঘটনাচক্রে তার সাথে এক ধরণের ঘনিষ্ঠতা হয়। আপুকেই একদিন সব খুলে বলি। তখন আমি নিজেকে বাইসেক্সুয়াল ভাবতাম। আপু আমাকে অসম্ভব রকমের গাইড করে, আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, ট্রেইন করে আমাকে সেই বাজে অনুভূতিগুলো থেকে বের করে আনে। বাকি কাজটা সময়ই করে দেয়। আমি বুঝতে পারি ভালোলাগার অনেকগুলো শেইড আছে। একজন মানুষকে বিভিন্ন কারণে ভালোলাগতে পারে। যত দিন যেতে থাকে আমি বুঝতে পারি ছেলেদের প্রতি আমার ভালোলাগাটায় আসলে কোনরকমের এটাচমেন্ট নেই। একজন মানুষ ভালো হলে তাকে ভালোলাগাটাই স্বাভাবিক। ছেলেদের যেসব বিষয় আগে আমার ভালো লাগত সময়ের সাথে আমি বুঝতে পারি আমি আসলে ওরকম হতে চাই। ওই মানুষটাকে চাই না। যেমন- আমার ছেলেদের ছোট চুল পছন্দ, তাদের পোশাক পছন্দ, জুতা পছন্দ, ছেলেদের বাইসেপ- ট্রাইসেপ- সিক্সপ্যাক পছন্দ। সময় আমাকে বুঝিয়ে দেয় আমি আসলে ওরকম ছোট চুল চাই, ওরকম পেশাক পরতে চাই, নিজের ওরকম মাসলওয়ালা বডি চাই, কিন্তু ওই মানুষটাকে চাই না। চাই নিজের মত কাউকে।

এখন এই ব্যপারটা অনেকেই জানে। আবার অনেকে জানেও না। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানে, যাদের সাথে উঠবস তারা জানে, তারা এটাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়। আসলে যারা স্বাভাবিক ভাবে নেয় তাদের সাথেই আমি মেলামেশা করি। তবে আমার পরিবারের কেউ জানে না। আমি চাই না জানুক। কারণ তারা এটাকে স্বাভাবিকভাবে নেবে না। হয়ত অনেক বিপদ নেমে আসবে আমার উপর। তবু আমি সবকিছুর জন্য প্রস্তুত। জন্মেছি যখন, লড়তে তো হবেই।

সেক্সুয়ালিটি জিনিসটা খুব কমপ্লিকেটেড। আমি যেহেতু এই বিষয়ে বেশি কিছু জানি না তাই আমার জন্য আরো বেশি জটিল। কিন্তু এখন আমি এটা জানি যে আমি আমাকে নিয়ে সবসময় খুশি থাকব। আমি সমপ্রেমী এটা নিয়ে আমি খুশি, আমি যদি কখনো নিজেকে স্ট্রেইট হিসেবে আবিষ্কার করি আমি তাতেও খুশি থাকব। আমি যদি বাই কিংবা ট্রান্সসেক্সুয়াল কিংবা অন্য যে কোন কিছু হই আমার তাতেও কোন আপত্তি নেই। প্রকৃতি আমাকে যেভাবে গড়েছে আমি সেভাবেই খুশি। বিষয়টা তো ভালোবাসার। যাকে ভালোবাসবো তাকেই ভালোবেসে যাব। লিঙ্গে কী আসে যায়?





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি