কৃষ্ণচূড়া
অনিন্দ্য অ্যাঞ্জেল

প্রিয় জুলহাজ ভাই,

গত দু’দিন এখানে অনেক বৃষ্টি ঝরলো জানো? গ্রীষ্মের এমন বৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়া গাছেরা প্রাণ ফিরে পায়। আমার টবে গত মার্চে কতগুলো কৃষ্ণচূড়ার বীজ পুতেছিলাম, এ দু’দিনের বৃষ্টির জল পেয়ে বীজ ফুটে সবুজ, সুন্দর আর প্রানবন্ত কিছু চারা বেরিয়েছে। হ্যাঁ, কৃষ্ণচূড়া, কৃষ্ণচূড়ার কথাই মনে পড়ে গেল হঠাৎ করে। এই এপ্রিলেই আরো বেশি মনে পড়ে কৃষ্ণচূড়াকে। এর লাল লাল ফুল আর সবুজ পাতাগুলোতে আমি বাংলাদেশের পতাকার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো তোমার আর তনয়দার রক্তের কথাও আমাকে মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সব মানুষের রক্তের রঙই লাল, রংধনুর মত সাতরঙা নয়। অবশ্য সাতরঙা রক্ত হলেই আমার কাছে ভাল লাগতো। সে যাকগে, এসো কৃষ্ণচূড়া নিয়েই গল্প করি কিছুক্ষণ।

তোমার মনে আছে, জাতীয় সংসদ ভবনের পাশের রাস্তাটির দু’পাশ দিয়ে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া লাগানো আছে সারি সারি? থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো দেখতে তোমার ভাল লাগতো? ভাল না লাগার কোন কারণ আছে? একে তো রক্তিম কৃষ্ণচূড়া, তাও আবার জাতীয় সংসদের কোল ঘেঁষে লাগানো। এই সেই জাতীয় সংসদ যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিরা একত্রিত হন জনগণের অধিকার তুলে ধরার জন্য। আমাদের অধিকার কে তুলে ধরবে? আমরা কি জনগণ না? নাকি ভুত-প্রেত? ওহ, না, আমি তো ভুলেই গেছি; আমরা তো “সমাজের কীট”। আমাদের তো সংসদ চত্বরে যাওয়া ঠিক নয়, আমাদের নর্দমাতেই থাকতে হবে অনন্তকাল! আমাদের অধিকার তুলে ধরার জন্য এমপি/মন্ত্রিদের কিংবা রাজনীতিবিদদের দরকার নেই। আমাদের জন্য তুমি ছিলে, তনয়দা ছিল, “রূপবান” ছিল। আর আজ তুমি নেই, কিছুই নেই! রূপবানদের “রূপই” আছে, প্রাণ নেই, ভাষা নেই। সংসদের চারপাশের শাপলা ফুলগুলোকে দেখি আর তোমার ব্যালকোনিতে মাটির চাড়িতে ফুটে থাকা তোমার শখের নীল শাপলার কথা মনে পড়ে যায়। শুনেছি নীল রঙ নাকি দুঃখের প্রতীক? কষ্টের প্রতীক? তাহলে তুমি কেন নীল রঙের শাপলা বেছে নিলে? আমিও নীল রঙ বেছে নিয়েছি তোমাকে অনুকরণ করে। তবে শাপলা নয়, নীল অপরাজিতা।

গত সপ্তাহে বীজ সংগ্রহ করেছি আমারই বড় গাছটি থেকে। তুমি নেবে নাকি নীল অপরাজিতার বীজ? লাগলে জানিও, কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিতে পারবো। কুরিয়ার??!! ওহ, হ্যাঁ, গতবছর এপ্রিলের আজকের এই দিনেই তো কুরিয়ারের লোকেরা গিয়েছিল তোমার ফ্ল্যাটে! তো কি কুরিয়ার করলো? লাল অপরাজিতার বীজ? না, সেসব কিছুই নয়। সব ছিল চক্রান্ত। ঘাতকেরা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছিল তোমাকে শেষ করবে বলে। ঠিক যেমন ১৯৭১ সালে করেছিল বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে। ঘাতকেরা তোমাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিল হয়তো, দেখতে চেয়েছিল তোমার রক্তের রঙ লাল, নীল নাকি সপ্তবর্ণা রঙধনু রঙ??!! তুমি আবারও তাদের ভুল প্রমানিত করলে, দেখিয়ে দিলে তোমার রক্তের রঙও লাল ঠিক আর সবার মত। দেখিয়ে দিলে ১৯৭১ সালে যে ৩০ লক্ষ মানুষ রক্ত দিয়েছিলেন, ঠিক তাদের মতই তোমার রক্তের রঙও লাল। তুমি “রঙধনু যাত্রা”-র আয়োজন করেছিলে বলে তোমার রক্তের রঙও বুঝি সপ্তবর্ণা হবে? এতটুকু বুদ্ধিমত্তাও কি ঘাতকদের ছিল না? তাতে কি? ঘাতকেরা তোমাকে মেরে হুরপরী পেল, আর তুমি চলে গেলে না ফেরার দেশে। তোমার মা আজও তোমার পথপানে চেয়ে আছেন। ভাবছেন যে তুমি হয়তো অফিস-ট্যুরে বিদেশে গিয়েছো, ভাবছেন; “এই তো খোকা কালকেই চলে আসবে”। সত্যি তুমি বিদেশেই গিয়েছো, যেখানে মানুষ একবারই যায়!!

তোমার নীল শাপলার কথা জানিনে, তবে শুনেছি তোমার সন্তানতুল্য (বিড়াল) মীরাকে অন্যত্র দত্তক দেওয়া হয়েছে(অ্যাডাপশনে পাঠানো হয়েছে)। আজকাল আমিও বিড়ালপ্রেমী হয়েছি তোমার মত, তোমার দেখাদেখি। তবে আমারটা পার্সিয়ান নয়, পুরোটাই দেশী, ঠিক আমারই মত। রানা প্লাজা ধ্বসে বধ্যভুমিতে পরিণত হয়েছে তা বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। সময়ের স্রোতের সাথে সাথে সবকিছু বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থাও তোমাদেরকে যে হত্যা করা হয়েছে সে কথা ভুলেই গিয়েছে। যদিও রানা প্লাজার মত পুরনো ঘটনা নয়, তবুও। যেহেতু “মাইনরিটি” বলে কথা। “মাইনরিটি” বা “সংখ্যালঘু”-দের বিচার পেতে নেই, কেননা তাদের তো বিচার চাইতেই নেই। অধিকার পেতে নেই, বেঁচে থাকতে নেই। কারণ, তারা ক্ষুদ্র, দুর্বল, অচ্ছুৎ এবং ভোট বাণিজ্যে এদের কোন প্রভাব বা ভুমিকা নেই। তোমার আর রানা প্লাজা ধ্বসে মারা যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে পার্থক্য কি জানো? তারা হয়তো ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতো না, আর তুমি ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকতে, ব্যস, এতটুকুই। সমপ্রেমীরা বর্তমান যুগের “দলিত”, “অচ্ছুৎ” এবং “সংখ্যালঘু”। যাদের হয়তো কোন অধিকার-বোধ নেই। তাই সমপ্রেমীরা ডি-জে পার্টিই করতে থাকুক, উগ্রবাদীরা কোপাতে থাকুক, সমাজ তাদের প্রশংসা করুক আর রাষ্ট্র আঙ্গুল তথা তেঁতুল চুষতেই থাকুক। আর জুলহাজ-তনয়-অভিজিৎ-রা মরতে থাকুক। তাতে কার কি আসে যায়? শাহবাগীরা মরছে, মরুক, তাতে কার কি?

তুমি কিন্তু আমার বাগানে নীল অপরাজিতা হয়ে, নয়তো লাল কৃষ্ণচূড়া হয়ে ফুটবে। আর আমি প্রতিবছর এই এপ্রিলে তোমাকে আরও কাছ থেকে দেখতে পাবো। কিংবা বর্ষায় নীপবিথির কদমগুচ্ছ হয়ে ফুটবে অথবা তোমার সেই প্রিয় নীল শাপলা??!!সে সবের মাঝেই শুধু তোমাকে খুঁজবো। আর আমার বিশ্বাস তোমাকে আমি সেখানেই পাবো, সেই নির্মল, নির্জন প্রকৃতির মাঝে!!

ইতি,
তোমার একজন শোকাহত ভক্ত।





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি