লন্ডনে এক দিন
রিয়াজ ওসমানী



লন্ডন, যুক্তরাজ্য

প্রিয় চন্দ্রমুখ,

আজ মনটা ভীষন খারাপ হয়েছে তুমি পাশে নাই বলে। বিলেতের সমপ্রেমীদের জন্য আজ ছিল একটি বিশেষ দিন। প্রতি বছরের মত আজকেও পালিত হল “প্রাইড” যখন অনেক সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামী ও তাদের শুভানুধায়ীরা লন্ডনের রাস্তায় বিভিন্ন ব্যানার, পোষ্টার ও পতাকা হাতে নিয়ে আনন্দ মিছিল বের করে। পরে বিভিন্ন জায়গায় পার্টিও হয়। আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন যে আমার ভালবাসার রাজপুত্রের হাত ধরে সেই মিছিলে যোগ দিব, একত্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করব আর তারপর সারা সন্ধ্যা আনন্দ করে বেড়াব। কিন্তু ভাগ্যটাই এমন যে ইচ্ছে হলেও তোমাকে এখনই আনতে পারছিনা এই দেশে।

আমি এখানে দুই একজন আইনজীবির সাথে কথা বলেছি। আমি এ দেশের নাগরিত্ব পাওয়ার পর কোন অজুহাতে তোমাকে এই দেশে আনতে পারলে তোমাকে আমি বিয়ে করতে পারব। এই দেশে গত কয়েক মাস যাবত সমকামীদের বিয়ে আইনগত করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এদেশের বর্তমান সরকার অভিবাসন কমিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশের মত দেশ থেকে মানুষজন আসা যাওয়ার পথ মোটামোটি বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের সমবয়সীদের টুরিষ্ট ভিসা এখন আর দিচ্ছেই না। আর স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে আসবে কি করে? এ দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর রয়েছে এখানকার কতৃপক্ষের নজরদারী। আগের অনেক ভুয়া ভিসার কারনে এখন এই সমস্যা।

গত বার আমি দেশে আসলে আমরা মালা বদল করেছি সারা জীবন একত্রে থাকব বলে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কেউ নেই যে আমাদেরকে বৈবাহীক সার্টিফিকেট দেবে। যদি থাকতো তাহলে হয়তো এই চিঠিটা তোমাকে লিখতে হত না। সার্টিফিকেট তো দূরের কথা। কেউ জানেও না, বুঝেও না যে আমরা কিভাবে একজন আরেকজনকে ভালবাসি। আমার তো মনে হয় বুড়া হলেও আমি তোমার প্রেমে মশগুল হয়ে বসে থাকব। আমি তোমার কোলে মাথা রেখে হারানো দিনের গান গুন গুন করে গাইব আর তুমি তোমার সুন্দর আঙ্গুলগলো দিয়ে আমার মাথা বুলিয়ে দিবে। আমরা আমাদের আগামী ছুটিতে কোথায় যাব তা নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করবে আবার পরে তা ভুলে গিয়ে আমার বানানো সুপ খেয়ে আমাকে তোমার সাথে এক করে ফেলবে। দু’জনের উপার্জনে আমাদের স্বাচ্ছন্দের জীবনে মিষ্টিময় আরো কিছু মুহূর্ত আনতে আমাদের সাথে থাকবে একটি বেড়াল যাকে আমরা নিজের সন্তানের মত ভালবাসব।

কিন্তু মাঝে মধ্যে এসবকে অবাস্তব মনে হয়। সারা পশ্চীমা দুনিয়াটা এতটা বদলে গেছে কয়েক বছরের মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবর্তনের হাওয়া আসতে শতাব্দী পার হয়ে যায়। তুমি জানো যে কোরান শরীফে আমাদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলা নেই। যা আছে তার অধিকাংশই হাদিসে। আর হাদিস বেশির ভাগই বানোয়াট যা আমি মানি না। কিন্তু আমাদের সমাজে আমাদের সম্বন্ধে এতটা অজ্ঞতা ও আমাদের বিরুদ্ধে এতটা নিষ্ঠুরতা কোথা থেকে এল তা নিয়ে ভাবতে গেলে দিন রাত নেই। কেউই মানতেই চায়না যে আমাদের জন্মই হয়েছে এইভাবে এবং সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে এভাবেই বানিয়েছেন। আমাদের ভালবাসার স্বীকৃতি যারা দিবেন তারাই আমাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেন, আমাদেরকে ঘৃণার পাত্র হিসেবে দেখে্ন, আমাদেরকে মারধর করেন, অত্যাচার করে খুন করার হুমকি দেন, আমাদেরকে চাকরি থেকে বর্খাস্ত করে দেন অথবা ব্ল্যাকমেইল করে একটি মেয়ের সাথে ঘর বাধতে বাধ্য করেন।

আর বৃটিশদের রেখে যাওয়া আইনের ৩৭৭ ধারা যেটা দিয়ে আমাদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং কারাদন্ডের হুমকি দেয়া হয়, সেটা আমাদের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকার আমাদের সংষ্কৃতির অজুহাত দেখিয়ে বার বার জাতিসংঘকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে আইনের খাতায় রেখে দেয়। তুমিই বল সোনা, আর কত দিন আমাদের দেশের সমকামী ছেলে ও মেয়েরা বাবা-মা, পরিবার ও সমাজকে দেখানোর জন্য বিপরিত লিঙ্গের কারোর সাথে ঘর বেধে ভালবাসার অভিনয় করবে? নিজের জীবন নষ্ট করে দিয়ে আরও আরেকজনেরও একই পরিনতি ঘটাবে? তোমাদের পারায় গত বছর দু’দুটা আত্মহত্যা হল। তারা কি মনঃকষ্টে দিন কাটাচ্ছিল তা শুধু তুমি আর আমিই জানি।

আমার চাকরির মার্ফত আগামী বছর আমি নাগরিত্বটা পেয়ে গেলে সাথে সাথেই তোমাকে নিয়ে আসব। তোমাকে নিয়ে বিলেতেই ঘর বাধবো। এখানে আমার পরিচিত কিছু গে বাঙ্গালী আছে। তাদের সাথে সুন্দর একটা সার্কেল নিয়ে থাকা যাবে। আর বৃটিশ সহ অন্যান্য দেশের পরিচিত মানুষ তো আছেই। দেখবে এদেশের ব্যস্ত জীবনেও মানুষ পার্টি করে বেড়ায়, জীবনটা ঊপভোগ করে। দেখার আছে অনেক কিছু। শেখারও আছে অনেক কিছু। তবে তা অনেকটা যান্ত্রিক গতিতে। সেটার এক রকম আনন্দ, বাংলাদেশে হয়তো হত সম্পূর্ন ভিন্ন। বর্ষার রাতে অবিরাম বৃষ্টির আওয়াজ ও কোমল বাতাসে বারান্দায় বসে আমার মাথায় তোমার আঙ্গুলের স্পর্ষ, আম কাঠালের গন্ধ ও কোলাব্যাঙ্গের কোলাহল লন্ডনের আবহাওয়ায়ে পাওয়া যাবে না ঠিকই। কিন্তু তোমাকে নিয়ে অজস্র রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে পারবো, তোমাকে যে কি রকম ভালবাসি তা আমার চোখের দৃষ্টি আর মুখের হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দেব। তোমার হাত ধরে রাস্তায় হাটার সময় মনে হবে এই যে আমার প্রিয়তম আমার সাথেই আছে এই দেশে, যেই দেশে আমাদের প্রেমকে অধিকাংশ মানুষ এখন চিনে ও সমর্থন দেয়। আমার মনে হবে যে জীবনে চাওয়া পাওয়ার আর কিছু নেই।

ইতি

চোখের বালি





-----------------------------------------------------
তালিকায় ফিরে যান
মূল পাতা
আমাদের সম্বন্ধে
সম্পাদকের বক্তব্য
তথ্য ভান্ডার
সৃজনশীলতা
সংবাদ
স্মৃতি চারণ
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
জরুরী আবেদন
নিবন্ধ
দন্ডবিধি